দ্য ওয়াল ব্যুরো : শুক্রবার হায়দরাবাদে পুলিশের এনকাউন্টারে মারা গিয়েছে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত চার অভিযুক্ত। গোটা ঘটনাটি নিয়ে যখন দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তখন শনিবার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিচার বহির্ভূত হত্যার ঘটনার নিন্দা করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এস এ বোবদে।
এদিন যোধপুরে হাইকোর্টের একটি নতুন ভবন উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি। ওই অনুষ্ঠানেই তিনি বলেন, “ধর তক্তা বিচার হয় না। বিচার এমনও হওয়া উচিত নয়, যা দেখে মনে হতে পারে কারও উপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে। কারণ, তা যদি মনে হয় তা সেই বিচার প্রক্রিয়া তার চরিত্র হারিয়ে ফেলে। সেটা শুধুই প্রতিশোধ নেওয়াতেই পর্যবসিত হয়”।
প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য যারপরনাই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। কারণ, হায়দরাবাদের এনকাউন্টারে যেভাবে চারজন অভিযুক্তকে গুলি করে মারা হয়েছে, তাতে প্রতিশোধ চরিতার্থ করার বার্তা স্পষ্ট বলে অনেকের মত। দ্বিতীয়ত, এই এনকাউন্টারকেই বিচার বলে যাঁরা মনে করছেন, তাঁদেরও বুঝতে হবে এই বিচার হয়েছে তাৎক্ষণিক। মৃতরা প্রকৃতপক্ষে ধর্ষক বা খুনি কিনা তার প্রমাণ হয়নি। এবং মানবাধিকার কর্মীদের অনেকের মতে, এও হতে পারে যে চারজনকে দিয়ে জোর করে অপরাধ স্বীকার করিয়ে নিয়েছে পুলিশ। যা আকছার হয়ে থাকে। হয়তো প্রকৃত অপরাধী অন্য কেউ।
আবার সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-অসন্তোষও অসঙ্গত নয়। কারণ, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার জন্য অনেকেই আইন আদালতের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। মানুষের সেই ক্ষোভ যে অমূলক নয় তা প্রকারান্তরে এদিন স্বীকার করেন বোবদেও। প্রধান বিচারপতি বলেন, এটা ঠিক যে বর্তমান ফৌজদারি ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ। প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রিতা রয়েছে। তা যে শুধরোনো দরকার সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও খুঁজতে হবে।
গত সপ্তাহের বুধবার রাত ৯টা ২০ নাগাদ, হায়দরাবাদে এনএইচ ৪৪-এর ওপর এক তরুণীর স্কুটির চাকা পাংচার করে দিয়েছিল অভিযুক্তরা। তার পরের এক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে গণধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারে তারা।
ধরা পড়ার পরে অভিযুক্তরা স্বীকার করেছে, তরুণী যাতে চিৎকার না করতে পারেন, সে জন্য তাঁর গলায় জোর করে মদ ঢেলে দিয়েছিল তারা। এমনকি তরুণীকে পোড়াতেও তাঁরই স্কুটির পেট্রোল ঢালা হয়েছিল বলেও স্বীকার করেছে তারা।
এই ঘটনায় তদন্তে নেমে, দু’দিন পরে, শুক্রবার চার জন অভিযুক্তকেই গ্রেফতার করে পুলিশ। মহম্মদ আরিফ, জল্লু শিবা, জল্লু নবীন ও চিন্তাকুন্তা চেন্নাকেশাভুলু নামের এই চার অভিযুক্তকে শনিবার ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়েছিলেন তেলঙ্গানার শাদনগরের ম্যাজিস্ট্রেট। তেলঙ্গানার চেরাপল্লীর সেন্ট্রাল জেলে ছিল তারা। ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্টে তাদের বিচার হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
ওদিকে সারা দেশের মানুষ ফেটে পড়েছিল ক্ষোভে, প্রতিবাদে। দেশের নানা প্রান্তে বিক্ষোভ দেখিয়ে ধর্ষকদের ফাঁসির দাবি তুলেছিলেন অনেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে দাবি করেছিলেন গণহত্যার। এ সবের মধ্যেই শুক্রবার কাকভোরে খবর এল এনকাউন্টারের। পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় নিহত চার ধর্ষকই।
নির্যাতিতা ও নিহত তরুণীর বাবা জানিয়েছেন, ঘটনায় শান্তি পেয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, “দশ দিন হয়ে গেল আমার মেয়েটা চলে গেছে। তার পরে শাস্তি হল ওর অপরাধীদের। সরকার ও পুলিশের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। এবার নিশ্চয় শান্তি পাবে আমার মেয়েটা।”
প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নির্ভয়া-কাণ্ডে নিহত তরুণীর আশা দেবীও। তাঁর কথায়, “আমি খুব খুশি এই শাস্তির কথা শুনে। এই ক’দিন এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসতে পারিনি আমি। আজ শান্তি পেলাম। খুব ভাল কাজ করেছে পুলিশ। যিনি এনকাউন্টার করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যেন কোনও পদক্ষেপ না করা হয়। আমার মেয়েটার খুনিরাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাজা পাক।”