দ্য ওয়াল ব্যুরো: টানা পাঁচদিন ধরে তাণ্ডব চলেছে উত্তর-পূর্ব দিল্লির বিস্তীর্ণ অংশে। প্রকাশ্যে এসেছে হিংসার নানা ছবি। ভাইরাল হয়েছে অসংখ্য ভিডিও। পরিসংখ্যান বলছে দিল্লি হিংসার বলি হয়েছেন ৪২ জন। তাঁদের মধ্যেই ছিল ২৪ বছরের তরুণ ফয়জান। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ লক-আপেই পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে ফয়জানকে।
সদ্যই প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, পাঁচটি ছেলেকে বেধড়ক মারছে উর্দিধারী চার-পাঁচজন। কিল-চড়-লাথি-ঘুষি-লাঠির বাড়ি বাদ যাচ্ছিল না কিছুই। সেই সঙ্গেই বারবার ওই উর্দিধারীদের বলতে শোনা গিয়েছিল, “আজাদি চাই? এই নে আজাদি।“ মার খাওয়া ওই ছেলেগুলোর মধ্যেই ছিল ফয়জান। মারতে মারতেই জোর করে তাঁকে 'জনগণমন' গাওয়ানো হয়েছিল। বাকিরা তখন উর্ধিধারীদের পায়ে ধরে প্রাণভিক্ষার আর্জি জানাচ্ছিল। এরপর মার খেতে খেতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল ফয়জান। অল্প বয়স, রোগা-পাতলা চেহারা, এত নারকীয় অত্যাচার শরীর আর সইতে পারেনি। ঘটনার দু’দিন পর হাসপাতালে মারা যায় ফয়জান।
ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য পুলিশকেই দায়ী করেছে ফয়জানের বড় চাই নঈম। তিনি জানিয়েছেন, গত ২৩ তারিখ বাড়ির কাছেই একটা জায়গায় গিয়েছিল ফয়জান। শান্তিপূর্ণ ভাবে সেখানে সিএএ বিরোধী আন্দোলন চলছিল। আচমকাই ওই এলাকায় কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটতে শুরু করে। ভয়ে-আতঙ্কে চিৎকার করে যে যেদিকে পারেন পালাতে শুরু করেন। মুহূর্তেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায় ওই এলাকায়। সেই সময়েই পুলিশের সামনে পড়ে যায় ফয়জান এবং আরও কয়েকজন। অভিযোগ, বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের বেধড়ক মারত শুরু করে পুলিশ। নঈমের কথায়, “পুলিশ নৃশংস ভাবে ওদের মেরে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। বারবার বলছি আজাদি চাই, এই নে আজাদি। একবারও জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি কীসের জন্য আজাদি চাই। এভাবে মারার অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে? ওরা কি আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পান না?”
[caption id="attachment_190921" align="aligncenter" width="875"]
মাঝে ফয়জানের দাদা নঈম এবং পরিবারের বাকিরা[/caption]
গুরুতর জখম অবস্থায় ফয়জান এবং বাকি ছেলেদের নিয়ে যাওয়া হয় গুরু তেগ বাহাদুর হাসপাতালে। নঈমের অভিযোগ, নামকাওয়াস্তে চিকিৎসা হতে না হতেই ফের ছেলেগুলোকে টেনে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। জ্যোতি নগর থানায় দু’দিন আটকে রাখা হয় ফয়জান এবং বাকি ছেলেদের। নঈমের দাবি, তাঁর ভাইকে লক-আপেই পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। নঈম আরও জানিয়েছেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধেবেলা থানা থেকে ফোন আসে। পরিবারকে বলা হয় থানায় গিয়ে ফয়জানকে নিয়ে আসতে। ভাইকে ফেরত পাওয়া আশায় ছুটে যান নঈম এবং ফয়জানের শ্যালক বাবলু।
থানা থেকে অবশ্য বেরিয়েছিল ফয়জানের ক্লান্ত রক্তাক্ত শরীর। সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। চোয়াল ভাঙা। চরম নির্যাতনের ছাপ গোটা শরীর জুড়ে। ফয়জানকে দেখেই বাবলু এবং নঈম বুঝেছিলেন লক-আপে নির্মম অত্যাচার চলেছে তাঁদের ভাইয়ের উপর। তাঁরা জানিয়েছেন, সারা রাত যন্ত্রণায় কাতরেছিলেন ফয়জান। বিড়বিড় করে বলেছিলেন, “পুলিশ আমায় মেরেছে, খুব মেরেছে।“ সকাল হতেই গুরুতর জখম ফয়জানকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে ছোটেন নঈম এবং বাবলু। ফয়জানকে রেফার করা হয় জিটিবি হাসপাতালে। সেখানেই তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
ফয়জানের মৃত্যুতে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন নঈম এবং বাবলু। দু’জনেই জানিয়েছেন, “কিছু না জেনে শুনে একটা নির্দোষ ছেলের প্রাণ কেড়ে নিল পুলিশ। এই অধিকার ওদের কে দিয়েছে? আজাদির কথা বলছিল ওরা, একবারও জানতে চেয়েছিল কী থেকে আজাদি চাই আমরা? আমাদের ভাইয়ের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। অকারণে অকালেই এভাবে ওকে হারালাম।“