দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ছোটা রাজন, অথবা দিল্লির সবথেকে বড় ডন নীরজ বাওয়ানা কিংবা বিহারের স্ট্রংম্যান মহম্মদ শাহাবুদ্দিন নয়, এই মুহূর্তে তিহাড় জেলে বন্দি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীদের নাম মুকেশ সিং, পবন গুপ্তা, অক্ষয় ঠাকুর ও বিনয় শর্মা। ভারতের সবথেকে বড় জেলের ১৮০০ কয়েদির মধ্যে এই চারজনকে নিয়েই সবথেকে সতর্ক তিহাড় জেল কর্তৃপক্ষ। ১ ফেব্রুয়ারি ফাঁসির আগে বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে নারাজ তাঁরা। জেলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বন্দোবস্ত করা হয়েছে নির্ভয়া গণধর্ষণ ও খুনের মামলায় ফাঁসির সাজা পাওয়া এই চারজনের জন্য। কোনও ভাবেই যাতে নিজেদের কোনও ক্ষতি এই চারজন করতে না পারে সেদিকে নজর দেওয়া হয়েছে।
জেল সূত্রে খবর, চার অপরাধীকে তিহাড়ের ৩ নম্বর জেলে রাখা হয়েছে। ফাঁসির সাজা পাওয়া অপরাধীদের এখানেই রাখা হয়। চারজন চারটি আলাদা সেলে রয়েছে। প্রতিটি সেল ছ’ফুট বাই আট ফুটের। চারদিকে দিক ঘেরা এই সেলগুলিতে কোনও লোহার বিম বা রেলিং নেই। চারদিকের দেওয়ালে কোথাও কোনও কাপড় দেওয়া নেই। প্রতিটি সেলের জন্য ২৪ ঘণ্টা দু’জন করে নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন রয়েছে। এমনকি সেল লাগোয়া বাথরুমে গেলেও তাদের মাথা যাতে দেখতে পাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা রয়েছে। এই ধরনের ব্যবস্থা এই জেলে এর আগে দেখা যায়নি বলেই জানিয়েছেন কর্মীরা।
জানা গিয়েছে, প্রতিটি সেল দিনে দু’বার করে পর্যবেক্ষণ করেন নিরাপত্তারক্ষীরা। বাইরে থেকে কী কী জিনিস আসছে তা পরীক্ষা করে তারপর ঢুকতে দেওয়া হয়। প্রতিটা সেলে দুটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। জেলের সুপারের ঘরে ২৪ ঘণ্টা সেই সিসিটিভি মনিটর করা হয়।
তিহাড় জেলের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ফাঁসির সাজা পাওয়ার পর চার অপরাধীকে এই সেলগুলিতে নিয়ে আসার আগে দেখে নেওয়া হয়েছিল, সেলের কোনও দেওয়ালে যেন কোনও পেরেক জাতীয় জিনিস বা ধাতব জিনিস না থাকে। কোনও ভাবেই যাতে নিজেদের আহত করতে না পারে চারজন, সেদিকে নজর দেওয়া হয়েছিল।
জেলের এক সিনিয়র আধিকারিক জানিয়েছেন, “এই মুহূর্তে কেবলমাত্র সেলের দেওয়ালে নিজেদের মাথা ঠুকে নিজেদের আহত করতে পারে চার অপরাধী। এই পদ্ধতি বেশিরভাগ অপরাধীই নেয়। নিজেকে আহত করে জেলের নিরাপত্তার দিকে প্রশ্ন তুলে ফাঁসি পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে এই চারজন তা করতে গেলে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নিরাপত্তারক্ষীরা সেলের মধ্যে ঢুকে তাদের আটকে দেবে।”
জানা গিয়েছে, চার অপরাধীর জন্য এই নিরাপত্তা রাখার কারণ হল এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত পঞ্চম অপরাধী রাম সিং জেলের বাথরুমে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। এক আধিকারিক জানিয়েছেন, “এই মামলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চারজনের মধ্যে একজনেরও কিছু হলে উপর মহলেরও অনেকের চাকরি যেতে পারে। তাই সবাই চাপে রয়েছেন। সবদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।”
জানা গিয়েছে, এই নিরাপত্তার বাইরে প্রত্যেকদিন নির্ভয়া দোষীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন জেলের ডাক্তার। সেখানে তাদের ওজন, শারীরিক অবস্থা দেখা হচ্ছে। সেই রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে সুপারের কাছে। পবন ছাড়া বাকিদের মধ্যে উদ্বেগের কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি বলেই জানিয়েছেন জেলের ডাক্তার। পবন মাঝেমধ্যে খেতেও চাইছে না।
কারা বিশেষজ্ঞ সুনীল গুপ্তা এই তিহাড় জেলে তিন দশকের বেশি থার্ড অফিসারের চাকরি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ফাঁসির সাজা পাওয়া কয়েদিদের সামলানো খুবই কঠিন। তিনি বলেছেন, “আমি আটটা ফাঁসি দেখেছি। তাই বলতে পারি, এই চারজনের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করা খুব প্রয়োজন। তারা নিজেদের আহত করে জেলের নিরাপত্তারক্ষীদের উপর দোষ চাপিয়ে ফাঁসি পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সেইসঙ্গে তাদের এই মুহূর্তে ধর্মীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে কথা বলানো উচিত। এতে তারা অনেক শান্ত হবে।”
জেল সূত্রে খবর, সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ফাঁসির সাজা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা রয়েছে জেলের অন্দরেও। কারণ এই প্রথমবার একসঙ্গে চারজনের ফাঁসি হতে চলেছে। এর আগে কখনও একসঙ্গে দু’জনের বেশি অপরাধীর ফাঁসি হয়নি তিহাড়ে।