দ্য ওয়াল ব্যুরো: বঙ্গভঙ্গের ৩ বছর পরেই ওপার বাংলার বরিশালে জন্মেছিলেন কালীতারা মণ্ডল। জ্ঞান হওয়ার পরেই দেখেছেন দুই বাংলার ভেঙে যাওয়া আটকাতে কী ভাবে সংগ্রাম করছে বাঙালি। দেশভাগ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, উদ্বাস্তু হিসেবে ভারতে আসা, সবই জ্বলজ্বল করে তাঁর চোখের সামনে। সেই কালীতারা এবার দিল্লির বয়স্কতম ভোটার। ১১১ বছর বয়সেও ভোট দিতে তৈরি তিনি।
দিল্লির বিধানসভা ভোটের আগে সংবাদসংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কালীতারা বলেন, “আমার মনে আছে আগে আঙুলে কালি লাগিয়ে ব্যালট পেপারে ভোট দিতাম। তারপরে ভোটিং মেশিন এল। এখন অবশ্য ভোট দেওয়া অনেক সহজ।”
ছেলে সুখরঞ্জনের কথায়, “ভোট দিতে মা খুবই আগ্রহী হয়ে থাকেন। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কোনওদিন দেখিনি ভোটের দিন মা ভোট দিতে যাননি। গত লোকসভা ভোটেও মা ভোট দিয়েছিলেন। এবারেও তাই করবেন।” এক পোলিং অফিসিয়াল জানিয়েছেন, বাড়ি থেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার আবেদন করেছিলেন কালীতারা। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ায় সেই সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না।
কালীতারার যাতে ভোট দিতে কোনও অসুবিধে না হয়, সে ব্যবস্থাও করেছে নির্বাচন কমিশনের দফতর। তাঁর ও তাঁর পরিবারের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নাতি সুরজকে নিয়ে ভোট দিতে যাবেন কালীতারা। সঙ্গে অবশ্য পরিবারের বাকিরাও থাকবেন।
বাকি ভোটারদের উদ্দেশে কালীতারার বার্তা, “ভোটের দিন বাড়িতে বসে থাকবেন না। গিয়ে নিজের অধিকার প্রয়োগ করুন। এটাই গণতন্ত্র। প্রত্যেকের উচিত ভোটে অংশ নেওয়া।”
অবশ্য কালীতারাকে নিয়ে ১০০-র বেশি বয়স্ক ১৩২ জন ভোটার রয়েছেন দিল্লিতে। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন পুরুষ ও ৬৪ জন মহিলা। তাঁদের প্রত্যেককে ভিআইপি ভোটারের সম্মান দেওয়া হয়েছে। এর আগে দিল্লির বয়স্কতম ভোটার ছিলেন বচ্চন সিং। গত বছর লোকসভা নির্বাচনের সময় তাঁর বয়স ছিল ১১১। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে মারা যান তিনি।
সামনের এপ্রিলেই ১১২ বছর বয়স হবে কালীতারার। কিন্তু এখনও সবকিছু স্পষ্ট মনে আছে তাঁর। ’৭১ সালের যুদ্ধের পরে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিলেন কালীতারা। প্রথমে উদবাস্ত হিসেবে অন্ধ্রপ্রদেশে গিয়ে ওঠেন তাঁরা। সেখানেই তাঁদের ছোট ছেলে সুখরঞ্জনের জন্ম। কিন্তু কিছুদিন পরে ফের বাংলাদেশে ফিরে যান তাঁরা। ভিটেমাটির টান উপেক্ষা করে থাকতে পারেননি। কিন্তু সেবারেও বেশিদিন থাকতে পারেননি। ফের ভারতে এসে মধ্যপ্রদেশে আশ্রয় নেন তাঁরা। অর্থাৎ দু’বার বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা।
কিছুদিন মধ্যপ্রদেশে থাকার পর দিল্লিতে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করে মণ্ডল পরিবার। আগে দিল্লি সরকারের দেওয়া আবাসনে থাকতেন তাঁরা। এখন অবশ্য নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। এই মুহূর্তে তাঁর বাড়িতে চারটি জেনারেশন রয়েছে। ২০১৯ লোকসভার পরেই জন্মেছে কালীতারার নাতির ছেলে জিয়াংশ।
চার ছেলে ও তিন মেয়ে কালীতারার। তার মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু দেখেছেন তিনি। ছেলেদের মধ্যে কেবল সুখরঞ্জন বেঁচে আছেন। এক মেয়ে বাংলাদেশে থাকেন। মাঝেমধ্যেই অবশ্য মাকে দেখতে দিল্লি আসেন তিনি।
এখন আর একটাও দাঁত নেই মুখে। কিন্তু ইলিশ মাছ খেতে সেই আগের মতোই ভালবাসেন। সেইসঙ্গে সবসময় মুখে থাকে পান। নিজে পান সেজে খান কালীতারা। নাতি সুরজের একটাই ইচ্ছে, আরও বেশ কিছু নির্বাচনে যেন ভোট দিতে পারেন তাঁর ঠাকুমা।