দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন মঞ্চ। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন সকলেই। অবস্থান, বিক্ষোভ, ধর্না, গান—সবই হচ্ছিল মোদী-শাহদের বিরুদ্ধে। হঠাৎ করে ভোটের কয়েক মাস আগে অসমের সেই শিল্পীমঞ্চ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অরাজনৈতিক মোড়ক তো রইলই না, উল্টে ওই মঞ্চের বেশির ভাগ সদস্য যোগ দিয়ে দিলেন কংগ্রেসে। আর বাকিরা ‘ভুল বোঝা’ দূরে সরিয়ে যোগ দিলেন গেরুয়া শিবিরে।
গত মঙ্গলবার সিএএ বিরোধী শিল্পী মঞ্চের অন্তত ৪০ জন অভিনেতা, অভিনেত্রী, গায়ক, সুরকার যোগ দেন কংগ্রেসে। ২৮ জন বুদ্ধিজীবী সরাসরি যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। মাস আটেক পরেই অসমের বিধানসভা ভোট। তার আগে অসমের শিল্পী শিবিরে এই আড়াআড়ি বিভাজন রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন অনেকে।
অসমের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক বাবু বরুয়া, সুরকার অজয় ফুকান এবং আরও ৩৮ জন শিল্পী যোগ দিয়েছেন কংগ্রেসে। গত মঙ্গলবার অসমের প্রদেশ কংগ্রেস দফতরে প্রদেশ সভাপতি রিপুন বড়ুয়া ও সর্বভারতীয় কংগ্রেসের তরফে অসমের পর্যবেক্ষক হরিশ রাওয়াতের উপস্থিতিতে তাঁরা সাবেক দলে যোগ দেন। একই সঙ্গে ওই দিনই ‘সিএএ নামানু’ (সিএএ মানব না) নামের একটি গান রিলিজ করেন তাঁরা। বুঝিয়ে দেন, গানে-সুরেই প্রতিবাদ হবে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে।
ঠিক তার পরের দিন অর্থাৎ বুধবার, গায়ক সীমন্ত শেখর, বাঁশি বাদক দীপক শর্মা, অভিনেতা প্রাণজিৎ দাস, রেবা ফুকানরা যোগ দেন বিজেপিতে। তাঁদের হাতে পদ্ম পতাকা তুলে দেন অসমের বিজেপি সভাপতি রঞ্জিত দাস।
বিজেপি শিবিরে যে বুদ্ধিজীবীরা যোগ দিয়েছেন, তাঁদের সাফ কথা, ভুল বুঝেছিলেন। সেই ভুল শুধরে নিতেই তাঁরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। অহমিয়া অভিনেতা যতীন বোরাও ছিলেন সিএএ বিরোধী এই শিল্পী মঞ্চে। তিনি গত ১৭ অগস্ট যোগ দিয়েছিলেন গেরুয়া শিবিরে। অনেকের মতে, যতীন বোরাকে দিয়েই বাকি শিল্পীদের নিজেদের শিবিরে শামিল করেছে বিজেপি।
দু’দিন আগেই গায়ক জুবিন গর্গকে অসমের কৃষি দফতর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ করেছে। তারপর তিনিও যোগ দিয়ে দেন বিজেপিতে। ভুলে গেলে চলবে না, গত বছর ভাইফোঁটার আগের দিন অসমেরই একটি অনুষ্ঠানে বাংলা গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ জুবিনকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল মঞ্চ থেকে। সিএএ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন জুবিন। তিনিও গেরুয়া শিবিরে যোগ দিয়ে জানিয়েছেন, তাঁর বুঝতে ভুল হয়েছিল। সিএএ সম্পর্কে যে ভাবে তাঁর মনে বিষ ঢালা হয়েছিল, সেই কারণেই তিনি বিপথে গিয়েছিলেন। এখন বুঝেছেন, সিএএ আসলে কেন দরকার।
২০১৪ সালে ‘অব কি বার, মোদী সরকার’ শীর্ষক বিজেপির প্রচার গান অসমীয়া ভাষায় গেয়েছিলেন সীমন্ত শেখর। তিনিও ছিলেন সিএএ বিরোধী মঞ্চে। বিজেপিতে যোগ দিয়ে এই গায়ক বলেছেন, মিথ্যের বেড়াজালের মধ্যে পড়ে তিনি ওই মঞ্চে গিয়েছিলেন। এখন বুঝেছেন, অহমীয়া ভাষা, হিন্দু ও প্রকৃত ভারতীয়দের জন্য এই আইন কতটা উপযোগী।
কংগ্রেস শিবিরে যোগ দেওয়া শিল্পীদের বক্তব্য, যে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই আইন কার্যকর করা হয়েছে তা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না। সুরকার অজয় ফুকান বলেছেন, “যে ভাবে কংগ্রেস এই কালা আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলন করছে তাতে এই মুহূর্তে অরাজনীতির মোড়কে দূরে সরে থাকা মানে আসল উদ্দেশকে দূরে ঠেলে দেওয়া হবে। সিএএ বিরোধী লড়াইকে আরো শক্তিশালী রূপ দিতেই কংগ্রেসের ঝাণ্ডার নীচে আসা।”
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রিপুন বড়ুয়া বলেন, “২০২১ সালে কংগ্রেস সরকার গড়বে অসমে। তরুণ গগৈয়ের নেতৃত্বাধীন সেই সরকার এই কালা আইনকে ছিঁড়ে ফেলে দেবে। সেই লড়াইকে আরও শক্তিশালী করতেই শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।”
সিএএ নিয়ে উত্তর-পূর্বে আগুন জ্বলেছিল। সেনা নামিয়ে, কার্ফু জারি করে বিক্ষোভ দমাতে হয়েছিল অসম সরকারকে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অসম সফর বাতিল করে দিয়েছিলেন। এই রাজ্যে ভাষাগত দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। কারণ বিরাট অংশের বাংলাভাষী মানুষ অসমে থাকেন। পাশের রাজ্য ত্রিপুরাতেও একই কারণে উদ্বেগ রয়েছে। দেশের অন্যপ্রান্তে সিএএ-এর বিরুদ্ধে যে কারণে আন্দোলন আর উত্তর-পূর্বের ক্ষোভের আগুনের মধ্যে কারণগত ফারাক রয়েছে বলে মত অনেকের।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অসমের জনজীবনে নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকাদের বিরাট প্রভাব রয়েছে। ফলে ধরেই নেওয়া যায়, আগামী বিধানসভা ভোটে দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যাওয়া শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা চাইবেন নাগরিকদের প্রভাবিত করতে। তবে কে কতটা ফসল ঘরে তুলতে পারল তা বোঝা যাবে ভোটের পরেই। তবে একথা ঠিক যে, বাংলার মতো অসমেও বুধিজীবী-শিল্পী শিবিরে বিভাজন হয়ে গেল আড়াআড়ি।