
শেষ আপডেট: 28 September 2021 13:53
মাটি দিয়ে মূর্তি গড়ার কৌশল ছোটবেলা থেকেই রপ্ত করেছে অবিনাশ। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকেই বাবাকে সাহায্য করেছে সে। পুজোর মরশুমে প্রতিবছরই নদিয়া থেকে কুমোরটুলি ছুটে আসে। কিন্তু যতই মাটি ঘাটুক, মনে মনে চাকরি করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। পড়াশুনা করতে করতেই ব্যাঙ্কেও কাজ করেছে সে। এখনও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি সারছে।
বাবার অসুস্থতার কারণে এবার অনেকটাই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে চন্দ্রনীল পাল। বায়না নেওয়া থেকে ঠাকুর তৈরি সব কাজেই হাত লাগাচ্ছে সে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার পর একটি চাকরি করার স্বপ্ন তাঁর চোখে।
অনেকে আবার শুধুমাত্র পারিবারিক ব্যবসাতে নিজেকে রাখতে চান। আবার কেউ কেউ ছিটকে বেরিয়ে যেতে চান। দুই ছবিই খুবই বর্তমান এখনকার কুমোর পাড়ায়। তবে বহু শিল্প ঘরের পরের প্রজন্ম এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে মত শিল্পীদের একাংশ।
পারিবারিক ব্যবসায় থাকলেও বিকল্প প্ৰয়োজন, মত কুমোরটুলির তরুণ প্রজন্মের।
বাবার ব্যবসায় সময় দিলেও ভবিষ্যতে পুরোপুরি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায় না অবিনাশ পাল। তাঁর কথায়, 'একটা চাকরি করার ইচ্ছা। পুলিশের পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছি। সামনেই পরীক্ষা।' কিন্তু হঠাৎ পারিবারিক শিল্প থেকে অন্য পেশায় যাওয়ার কারণ কী? অবিনাশের কথায়, 'আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছেন। কিন্তু ওই প্রজন্মে ঠিক ছিল। আমাদের পড়াশুনা করার পর আর মাটি ঘাঁটা, এইসব পছন্দ হয় না।' এই পরিবারের বাকিরা আগেই অন্য কাজে গেছে তাই সেই পথেই হাঁটতে চায় অবিনাশ।
আর এক শিল্পী বাবু পালের ছেলে চন্দ্রনীল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছে। ক্যাম্পাসিং চলছে চাকরিও জুটে যাবে একটা। পুজোর সময় পারিবারিক কাজে সময় দিতে কুমোরটুলি আসবে, তবে পেশা হিসেবে চাকরিকেই বেছে নেবে চন্দ্রনীল। তাঁর কথায়, "টাকার অভাব তো আছেই একটা কারণ, তাছাড়া পড়াশুনা করেছি। তাই চাকরির ইচ্ছা আছে।" তবে পারিবারিক শিল্পেও সবসময় থাকার চেষ্টা করবে বলে জানায় শুভ্রনীল।
অন্যদিকে, আর্ট কলেজে পড়াশুনা করে নিজেই আর্টের সম্ভার সাজিয়ে গ্যালারি সাজিয়েছে অভিলাস পাল। তাঁর কথায়, "কুমোরটুলিতে বড় হওয়ার কারণে মৃৎশিল্প থাকবে পরিবারে। কিন্তু আর্ট কলেজে পড়াশুনা করার ফলে এই মাটির মূর্তি তৈরির পাশাপাশি আর্ট জিনিসটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। মাটির কাজ থেকে পুরোপুরি না বেরিয়ে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি।' সেই চেষ্টার সম্ভারই হল রবীন্দ্র সরণির এক গ্যালারি।
কুমোরটুলির শিল্পী মহলের অনেকেরই কথায়, মূর্তি তৈরির খাটুনি ভয়েই পরের প্রজন্ম পিছিয়ে যাচ্ছে এই শিল্প থেকে। শিল্পী অমিত পাল বাপ-ঠাকুরদার ব্যবসা চালিয়েছেন এতদিন। কিন্তু তাঁর ছেলে আর এই ব্যবসায়ে আসতে চায় না বলে আক্ষেপ অমিতবাবুর। তাঁর কথায়, 'এইসব কাজে প্রচুর খাটুনি। তাই কাজে আসতে চায় না ছেলে।'
সেই একই সুরে সুর মিলিয়ে অখিল পাল বলেন, 'আমরা পাঁচ ভাই। আমি বাদে কেউ এই ব্যবসায় আসেননি। ছেলেও এই ব্যবসায় আসতে চায় না।' তাহলে কী হবে পরবর্তীতে? তাঁর কথায়, 'যতদিন আমি পারব চালাব। তারপর কি হবে জানি না এখনও।'
শিল্পী অশোক পালের আবার মেয়ে বাইরে থেকে পড়াশুনা করছে। বাবার ব্যবসায় আসার তেমন ইচ্ছা নেই তাঁর। অশোক পালের কথায়, 'কুমোর kপাড়ার অনেকেই আর এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না। যাঁরা পড়াশুনা করেছে তারা কেউ কেউ অন্য ব্যবসা করছে, কেউ বা চাকরি। মাস গেলে ১০ হাজার পেলেও তো সেটা সিকিওর। তাই সেদিকেই ঝুঁকছে অনেকে।'
এই শিল্পে সম্মান আছে, কিন্তু পয়সা নেই তাই ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম, এমনই মত কুমোরটুলি মৃৎশিল্প সংস্কৃতি সমিতির জয়েন্ট সেক্রেটারি বাবু পালের। তাঁর কথায়, 'উদীয়মান শিল্পীরা দেখছে বাবারা এই ব্যবসা থেকে তেমন পয়সা পাচ্ছে না। বাজার খারাপ হচ্ছে দিন দিন। এই শিল্পে সম্মান থাকলেও দিনের শেষে ঘরে পয়সা নেই। খাটতে না পারলে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নেই। এই শিল্পে বড় ব্যাপার সময়ের। সময়ে ডেলিভারি দেওয়ার বায়না থাকে। সব দেখে এই শিল্পে অনেক উদীয়মান শিল্পীই আসতে চাইছে না।'
তবে ভবিষ্যতে কি হাতে গোনা হয়ে পড়বে এই কুমোরটুলির গোলার সংখ্যা। আশঙ্কা এমন থাকলেও কেউ না কেউ এই ব্যবসায় এগিয়ে আসবে বলে আশাবাদী শিল্পীরা। কুমোরটুলির চেহারা পাল্টাবে না, আগের মতোই থেকে যাবে এই পাড়ার চিত্র। পুজোর আগে ব্যস্ততা ঘরে ফেরাবে শিল্পীদের।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'