Global house crow monitoring project এর প্রতিষ্ঠাতা ডঃ কলিন রায়াল জানিয়েছেন “ভারতীয় কাকদের জ্বালায় আফ্রিকার শহরাঞ্চলে স্থানীয় পাখিদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।" সত্যিই ভারতীয় কাকের দল পূর্ব আফ্রিকায় ফসল ও গৃহপালিত ছোট প্রাণীদের চরম ক্ষতি করে চলেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা থেকে জানা গেছে জাঞ্জিবারের ভুট্টা উৎপাদন ১২.৫ শতাংশ কমে গেছে ভারতীয় কাকদের জন্য।
[caption id="attachment_149385" align="alignnone" width="1600"]
ভারতীয় কাক[/caption]
২০১০ সালে Wildlife Conservation Society of Tanzania (WCST ) প্রকাশিত একটি রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল দার-এস-সালাম শহরে বসবাসকারী মানুষের বাড়িতে উৎপাদিত অর্ধেক ডিম এবং ৭৫ শতাংশ মুরগীর ছানা খেয়ে নিয়েছিল এই কাকের দল।
Citizens Initiative for Adaptation Association (CIAA) সংস্থার প্রেসিডেন্ট মার্টিন ব্লক জানিয়েছেন," শুধু স্থানীয় পাখি ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, ভারতীয় কাকের দল মানুষের মধ্যে বিভিন্ন জীবাণুও ছড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও এই কাকদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিমান চলাচল। আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বিমান সংস্থাগুলির।"
শুধু তানজানিয়ার দার-এস-সালাম নয়, কেনিয়ার উপকূলীয় শহর মোম্বাসার আকাশেও এখন শুধুই কাক আর কাক। ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাচ্ছে খাবার। যেখানে সেখানে ছুঁড়ে ফেলছে এঁটো-কাঁটা। ফেলে দেওয়া খাবারের দিকে এইসব কাকেরা এখন ফিরেও তাকাচ্ছে না।
[caption id="attachment_149479" align="aligncenter" width="399"]
ঝটিকা হানার পূর্ব মুহূর্তে[/caption]
ভারতীয় কাকেদের নজর রেস্টুরেন্টের সুস্বাদু এবং দামী খাবারের দিকে। এই কাকেরা রেস্টুরেন্টে ঢুকে খাবার ছিনিয়ে নেয়, চেয়ারটেবিলের উপর মলত্যাগ করে। সমস্যা এতই জটিল হয়ে উঠেছে যে মোম্বাসার প্রায় সব রেস্টুরেন্ট পেশাদার কাক-তাড়ুয়া নিয়োগ করেছে।
[caption id="attachment_149453" align="alignnone" width="598"]
ভারতীয় কাকের জ্বালায় টেবিলে খাবার আর বই ফেলে পালিয়েছে টুরিস্ট[/caption]
কাকের জ্বালায় সবচেয়ে বেশি ভুগছে তানজানিয়ার স্বয়ংশাসিত প্রদেশ জাঞ্জিবার। প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ ভারতীয় কাক এই প্রদেশে বসবাস করে। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এত ভারতীয় কাক আফ্রিকায় এল কীভাবে!
ইতিহাস থেকে জানা গেছে, জাঞ্জিবারকে আবর্জনা থেকে মুক্ত করার জন্য ১৮৮০ সালে ব্রিটিশরা ভারত থেকে এই দেশেই প্রথম আমদানী করেছিল কয়েক হাজার 'প্রকৃতির ঝাড়ুদার' অর্থাৎ ভারতীয় কাক।
আবর্জনা ও উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে ভারতীয় কাকের দল জাঞ্জিবারকে বানিয়ে ফেলল তাদের অভয়ারণ্য। অস্বাভাবিক গতিতে বংশবৃদ্ধি করতে করতে মাত্র কয়েক দশকেই গোটা পূর্ব আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বৃটিশদের উদ্দেশ্য ছিল যা, হল তার ঠিক বিপরীত।
[caption id="attachment_149483" align="aligncenter" width="1800"]
আফ্রিকার সোনালী বাদুড়কে তাড়া করেছে ভারতীয় কাক[/caption]
ভারতীয় কাকদের অত্যাচার এতই চরমে উঠেছিল, তানজানিয়া ও কেনিয়া সরকার ১৯১৭ সালে তাদের ক্ষতিকর প্রাণী বলে ঘোষণা করে। তাদের শিকার করতে উৎসাহ দেয় স্থানীয় বাসিন্দাদের। কারণ এই ভারতীয় কাকরা হাজারে হাজারে, দল বেঁধে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘোরাফেরা করে ফসল নষ্ট করছিল।
দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল বিভিন্ন পাখির বাসায়। তাদের ডিম ও শাবকদের খেয়ে নিচ্ছিল। গৃহস্থের বাড়ি ও খাবারের দোকান প্রায় লুঠ করা শুরু করেছিল।
[caption id="attachment_149485" align="alignnone" width="852"]
গৃহস্থের খাবার নিমেষে সাবাড়[/caption]
এরপর থেকে কেটে গেছে ১০০ বছর। পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভারতীয় কাকেদের অত্যাচার একটুও কমেনি দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। 'মোম্বাসা নগরউন্নয়ন দপ্তর' আগামী পাঁচ বছরে কাকের সংখ্যা কমানোর জন্য তিন লক্ষ ডলারের একটি প্রজেক্ট শুরু করেছে। জাঞ্জিবার তাদের দেশে এই প্রজেক্টের জন্য ১৫ লক্ষ মার্কিন ডলার খরচ করবে বলেছে। কিন্তু এই প্রজেক্ট আদৌ সাফল্য পাবে কি না এ বিষয়ে সন্দিহান দুই দেশই।
[caption id="attachment_149493" align="alignnone" width="800"]
আফ্রিকায় তোফা আছে ভারতীয় কাক[/caption]
কারণ, ২০১০-২০১৩ সালের মধ্যে তানজানিয়া প্রায় ১২ লক্ষ কাক মেরেছিল। কিন্তু কয়েকমাসের মধ্যে কাকের দল একই পরিমাণ শাবকের জন্ম দিয়েছিল। আসলে আফ্রিকার জনসংখ্যা যত বাড়ছে, বর্জ্যপদার্থের পরিমাণও বাড়ছে। ফলে পাল্লা দিয়ে সংখ্যায় বাড়ছে ভারতীয় কাকেরা।
পরিবেশবিদরা বলছেন ভারতীয় কাকেরা এতই চালাক, এদের নিয়ন্ত্রণ করাই মুস্কিল। গত ১০০ বছর ধরে হাজার চেষ্টা করেও ভারতীয় কাকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। তবে তাঁরা এটাও বলছেন, মানুষ যদি শহরের যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা কমিয়ে দেন, কাকেদের সংখ্যা এমনিই কমে যাবে। কিন্তু মানুষ তাঁদের কথা শুনলে তো। তাই আফ্রিকার আকাশে ভারতীয় কাকের হানা চলছে চলবে।


