চলে গেলেন লিরিল গার্লের স্রষ্টা অ্যালেক পদমসি
শমীক ঘোষ
চলে গেলেন অ্যালেক পদমসি।
মুম্বইতে এক নামী পাঁচতারা হোটেলে সামনে থেকে দেখেছিলাম তাঁকে। সরু মুখ, মোটা গম্ভীর চশমার সঙ্গে সামান্য কোঁকড়া ঘাড় থেকে নীচে নামা বড় বড় চুল, থুতনির কাছে অল্প দাড়ি। এক নজরে দেখলে মনে হয় অধ্যাপক, আবার পরমুহূর
শেষ আপডেট: 17 November 2018 08:22
শমীক ঘোষ
চলে গেলেন অ্যালেক পদমসি।
মুম্বইতে এক নামী পাঁচতারা হোটেলে সামনে থেকে দেখেছিলাম তাঁকে। সরু মুখ, মোটা গম্ভীর চশমার সঙ্গে সামান্য কোঁকড়া ঘাড় থেকে নীচে নামা বড় বড় চুল, থুতনির কাছে অল্প দাড়ি। এক নজরে দেখলে মনে হয় অধ্যাপক, আবার পরমুহূর্তে দেখলেই মনে হয় না ইনি পুরোদস্তুর সাহেব। ইংরাজি উচ্চারণেও তাই।
দেখে মনে হয়েছিল যেন পঞ্চাশ পার কোনও প্রৌঢ়। আসলে তখন তাঁর বয়স আশির শেষ প্রান্তে।
কথাও হয়েছিল। সামান্য। ভদ্র, ভীষণ ভদ্র মানুষটা।
আর ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই বার বার মনে পড়ছিল একটা সুর। ‘লা লালা লা’। লিরিলের বিজ্ঞাপনের সুর। পাহাড়ি ঝর্ণার সফেন জলে স্নান করছে বিকিনি সুন্দরী। সাতের দশক থেকে শুরু হয়ে এই সেদিনও মুখ বদলে সে আসত পর্দায়।
আটের দশকের মাঝামাঝি টিভিতেই প্রথম দেখা তাকে। আম ভারতীয় দর্শকের কাছে বিকিনি তখনও এত ফিল্মি সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। লিরিল গার্ল মানেই তাই তখন এক কল্পলোকের শিহরণ।
https://www.youtube.com/watch?v=D7MIWUY6A48
আর তার ঠিক পাশাপাশি শাড়ি ব্লাউজ আর কপালের টিপে আটপৌরে মধ্যবিত্ত সার্ফের ললিতাজি। পরিবারের কর্ত্রীর মতোই পরখ করে নেওয়া সুরে যিনি বলেন ‘সস্তে অউর আচ্ছে চিজ মে ফারক হোতা হ্যায়।’
আবার ভারতীয় সাধ্যবিত্তের সাধ আর বিত্ত দুটোই যখন গাড়ি বলতে বোঝে একটা নিজস্ব দু’চাকা, তখন ‘বুলন্দ ভারত কি বুলন্দ তসবির’ হামারা বাজাজ!
কিংবা চেরি ব্লসমের চার্লি চ্যাপলিন!
সাদা কালো টেলিভিশনের প্রথম যুগে দেখা এই সব অ্যাডের জনক সেই তিনিই। অ্যালেক পদমসি। ভারতের ‘ব্র্যান্ড ফাদার’।
বয়স হয়েছিল নব্বই বছর।
ফিল্মের মগ্ন দর্শকের তাঁকে অবশ্যই মনে পড়বে রিচার্ড অ্যাটেনবরোর গান্ধী ছবির মহম্মদ আলি জিন্না হিসেবে।
ভারতীয় ইংরাজি থিয়েটারেরও এক ভীষণ পরিচিত নাম ছিলেন তিনি। সেই জন্যও পেয়েছিলেন সঙ্গীত নাটক অকাদেমির লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। শেষ নির্দেশিত নাটক ‘ব্রোকেন ইমেজেস’ কয়েক বছর আগেই আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছিল।
কিন্তু থিয়েটারের থেকেও বেশি বিখ্যাত ছিলেন পদমসি তাঁর বিজ্ঞাপনী কেরিয়ারের জন্যই। ছিলেন লিনটাস অ্যাডভার্টাইজিং-এর প্রধান কার্যনির্বাহী আধিকারিক। তাঁর নেতৃত্বেই ভারতবর্ষের অন্যতম নামী অ্যাড এজেন্সি হয়ে ওঠে লিনটাস।
বিজ্ঞাপন নিয়ে লেখা তাঁর বই ‘আ ডবল লাইফ’ পড়ানো হয় দেশবিদেশের ম্যানেজমেন্ট স্কুলে।
https://www.youtube.com/watch?time_continue=1&v=Ke7rdiQGv5g
পদ্মশ্রী পাওয়া অ্যালেক পদমসির ইংরাজি শেখা কিন্তু স্কুলেই। কচ্ছে খোজা মুসলিম পরিবার থেকে উঠে আসা তাঁর বাবা ধনী ছিলেন। কিন্তু শিক্ষিত ছিলেন না। আট সন্তানের মধ্যে শুধু ছেলেদেরই স্কুলে পাঠিয়েছিলেন অ্যালেকের বাবা। অ্যালেকেরই দাদা পেন্টার আকবর পদমসিও।
অথচ রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের সেই অ্যালেকই আঠারো বছর বয়সে ধর্মকে প্রশ্ন করে নিজেকে অজ্ঞেয়বাদী বলে ঘোষণা করে বসেছিলেন। আবার ধর্মকে প্রশ্ন করা অ্যালেককেই তাঁর কাজের জন্য দারুল উলুম গ্র্যান্ড মুফতি সম্মান দিয়েছে।
পদমসি আসলে উপাধি। কচ্ছের গুজরাতি ভাষায় তা পদ্মশ্রীরই সমতুল্য। কে জানত সেই পরিবারেরই একজন অ্যালেক পরে সত্যিই পদ্মশ্রী সম্মান পাবেন।
অ্যালেকের জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল ভারতীয় বিজ্ঞাপনী জগতের এক বিরাট অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও।