দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিডের থার্ড ওয়েভ আসন্ন। তার মধ্যেই আবার করোনার ডেল্টা প্লাসের সতর্কতা জারি হয়েছে মহারাষ্ট্র, কেরলে। পশ্চিমবঙ্গেও ঢুকে পড়েছে কোভিডের ডেল্টা ভ্যারিয়ান্টের এই উপপ্রজাতি। সঙ্কটের এই সময়ের মধ্যেই পুজোর মরশুম চলে এসেছে। গণেশ পুজো সামনেই, এর পরে বাংলায় দুর্গাপুজো রয়েছে। করোনাকে ঘিরে তাই হাজারো চিন্তা। মুম্বই ও দিল্লিতে ইতিমধ্যেই গণেশ পুজো ও দর্শণে নানা বিধিনিষেধ বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। পুজো মণ্ডপে ঢুকে দর্শন একেবারেই নিষিদ্ধ। উৎসবের বিধিতেও কড়া নির্দেশিকা জারি হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, দুর্গাপুজোয় তাহলে কলকাতা কী করবে? প্রতিমা দর্শনে কি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হবে?
মুম্বই ও দিল্লিতে গণেশ পুজোয় বিধিনিষেধের পরেই দুর্গাপুজো নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যে কোনও পুজোর মধ্যে দেশে প্রথমে পালিত হয় গণেশ উৎসব বা গণেশ চতুর্থী৷ কলকাতায় যেমন দুর্গাপুজোর আড়ম্বর, তেমনি মহারাষ্ট্রে গণেশ পুজোর কৌলীণ্য ও আড়ম্বরের কথা সকলেরই জানা। করোনার আবহে গত বছরও হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ দিয়ে দর্শনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। অনলাইনে দর্শন সারতে হয়েছিল। এ বছরও তেমনই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। বৃহন্মুম্বই কর্পোরেশন গণেশ পুজোয় কিছু নিয়মনীতি বেঁধে দিয়েছে, যেমন—১) এ বছর মণ্ডপে গণেশ মূর্তির উচ্চতা চার ফুটের বেশি রাখা যাবে না। বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে মূর্তির উচ্চতা ২ ফুটের মধ্যেই থাকতে হবে। ২) পুজো মণ্ডপে ঢুকে দর্শন করা যাবে না, অনলাইনে হবে দর্শন। ৩) কোনও মূর্তি বাজার থেকে কেনা যাবে না৷ সব কিনতে হবে অনলাইন৷ মূর্তি কেনা ও বিসর্জন দিতে পারবেন পাঁচ জন, যাঁদের ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ নেওয়া হয়েছে। ৪) দর্শনের ক্ষেত্রেও অনলাইন ভিডিও দর্শনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে৷ যারা আসবেন তাদের অনলাইন অনুমতি নিতে হবে৷ কোনও জাঁকজমক করা যাবে না৷
কী হবে কলকাতার পুজোয়?
এবার আসা যাক কলকাতার পুজোয়। এ বছর রাজ্যে দুর্গাপুজোয় কী কী বিধিনিষেধ হতে পারে তা জানিয়েছেন কয়েকটি বিখ্যাত পুজো কমিটির কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এ বছর মণ্ডপে ঢোকা ও প্রতিমা দর্শনের ক্ষেত্রে কী কী নিয়ম থাকবে তা পরে জানানো হবে। গত বছর কোভিড পরিস্থিতির কারণে পুজো কার্নিভাল বাতিল হয়েছিল। মণ্ডপে ঢোকার ক্ষেত্রে আদালতের বিধিনিষেধও ছিল। বিসর্জনের ক্ষেত্রেও নানা নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এ বছর কী হবে তা উপ-নির্বাচনের পরেই জানা যাবে। তবে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ১৫-১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিসর্জন চলবে। ১৮ তারিখ পুজো কার্নিভাল করা যায় কি না তা ভেবে দেখা হবে।

মাস্ক, স্যানিটাইজার, পারস্পরিক দূরত্ব মেনে চলা বাধ্যতামূলক। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, রাজ্যে এখন কোভিড পরিস্থিতি অনেকটাই ভাল। অক্টোবরে যদি তৃতীয় ওয়েভ আসে তা হলে পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নবান্নের এক আধিকারিক বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী যা বলেছেন এর বাইরে নতুন করে কিছু বলার নেই। রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি ও সংক্রমণের কার্ভ দেখে তবেই পুজোর সময় কী করা হবে সে ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা হবে।
কী বলছেন কলকাতার বিখ্যাত কয়েকটি পুজো কমিটির কর্মকর্তারা?
চেতলা অগ্রণী— চেতলা ক্লাবের কর্মকর্তা সমীর ঘোষ জানালেন, মণ্ডপে ২৫-৩০ জন করে ঢোকার ব্যবস্থা আছে। বেশিরভাগই বাইরে থেকে দর্শন করে চলে যান, মণ্ডপের ভেতরে ঢোকার দরকার পড়ে না। এ বছর এমনভাবেই পুজোর আয়োজন হচ্ছে যাতে ভেতরে ঢোকার দরকারই না পড়ে, বাইরে থেকে দর্শন করা যায়। অনলাইনে দর্শনের ব্যবস্থাও আছে। চেতলা ক্লাবের ওয়েবসাইটে অনলাইনে পুজো দেখা যাবে, ভোগের ব্যবস্থাও আছে।
বড়িশা ক্লাব—সরকার যা বলে দিয়েছে তাই হবে। রাজ্য সরকার যে নিয়ম করবে তাই মেনে প্রতিমা দর্শন করা যাবে। মুম্বই ও কলকাতার পরিস্থিতি এক নয়। মুম্বইতে যে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, কলকাতায় তা হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। সবাই চায় পুজোটা হোক।
শ্রীভূমি ক্লাব—শ্রীভূমি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিকে গোস্বামী বলছেন, গত বছরের মতো এ বছরেও একই ব্যবস্থা থাকছে। অনলাইনে পুজো দেখার ব্যবস্থা থাকবে, ফেসবুক, ইউটিউবে অনলাইন লাইভ চলবে। মণ্ডপে ঢুকেও দর্শন করা যাবে। কোভিড বিধি মেনেই সব ব্যবস্থা করা হবে।
নাকতলা উদয়ন সংঘ—রাজ্য সরকার এখনও কিছু বলেনি, তাই এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়, বললেন নাকতলা উদয়ন সংঘের একজন কর্মকর্তা। তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী যা বলবেন তা মেনেই কাজ হবে। তবে আমাদের অনলাইনে প্রতিমা দর্শনের ব্যবস্থা গত বছরও ছিল, এ বছরেও থাকছে।
থার্ড ওয়েভ আসন্ন, দুর্গাপুজো নিয়ে কী বলছেন ডাক্তারবাবুরা
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (সিনিয়র পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট) ডাক্তার সুবর্ণ গোস্বামী বলছেন, কোভিড পজিটিভিটি রেট যদি বাড়ে তাহলে সংক্রমণের ঢেউ প্রবলভাবে আছড়ে পড়বে। তখন সেই মতো পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাস্ক, স্যানিটাইজার সঙ্গে রাখা দরকার, বেশি ভিড় বা জমায়েত করা ঠিক হবে না। এখন থেকেই যদি মাস্ক-বিধিতে কড়াকড়ি করা হয় তাহলে লাভই হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ অনির্বাণ দলুই বলছেন, উৎসব হোক। সকলকে কোভিড বিধি মেনেই উৎসব পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে কোনও রকমের উৎসবে যে ভিড় বা জমায়েত হয়, তা সংক্রমণকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলার জন্য আদর্শ। তাই ভিড় এড়িয়ে নিউ নর্মালে কীভাবে পুজো করতে হবে তা আমাদের বুঝে নিতে হবে। পুজোর ভিড় এড়াতে কী করণীয় তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে সচেতন থাকতে হবে। আগের বারে যেমন হাইকোর্টের নির্দেশ ছিল যে মণ্ডপের ভেতরে ভিড় করা যাবে না, এ বছরও তেমন নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত। স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (SOP) যাকে বলা হয়, তেমনই কিছু স্বাস্থ্য দফতরের তরফ থেকে আসা উচিত। পুজোটা সুষ্ঠুভাবে হোক, যাতে পুজোর পরে আক্রান্তের সংখ্যা না বেড়ে যায় সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
ডাক্তারবাবু আগেই বলেছিলেন, সেরো সার্ভের রিপোর্টে দেখা গেছে, কেরলে সেরো পজিটিভের সংখ্যা ৪৪ শতাংশের মতো। মানে হল, খুব কম জনের মধ্যে কোভিডের অ্যান্টিবডি রয়েছে। সেদিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ ভাল জায়গায় আছে। সেরো পজিটিভের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। রাজ্যে এখন কোভিড পরিস্থিতি ভালর দিকেই। এখনও অবধি আমাদের রাজ্য সেরো সার্ভের রিপোর্টে খুব একটা খারাপ জায়গায় নেই। পুজোর সময় কী নিয়ম থাকবে তা রাজ্য় সরকার সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে প্রতিমা দর্শন যদি করতেই হয় তাহলে মাস্ক, পারস্পরিক দূরত্ব রাখা খুব দরকার। ছোট বাচ্চা থাকলে অনলাইনে দর্শন করাই ভাল। গত বছরও পুজো কমিটিগুলো অনলাইনে দর্শন করার ব্যবস্থা রেখেছিল। ভিড় যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। রাজ্যের কোভিড গাইডলাইন মেনে চলুন। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস বিপদের কারণ হতে পারে।