দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিজের ছোটবেলাকে গানে বেঁধেছিলেন কবীর সুমন। স্কুল, খেলা, স্কুল ছুটি নিয়ে সেই নস্টালজিয়া, যা লেগেছিল তাঁর শহর কলকাতার গায়ে। সুমন লিখেছিলেন—‘প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন, প্রথম বার ফেল/ প্রথম ছুটি হাওড়া থেকে ছেলেবেলার রেল/ প্রথম খেলা লেকের মাঠে, প্রথম ফুটবল/ মান্না-পিকে-চুনির ছবি বিরাট সম্বল……!”
আর গত প্রায় ১৭ মাস ধরে ভারতের শিশুদের কাছে স্কুল নেই, খেলার মাঠ নেই। দমবন্ধ করা ছুটি (প্রকারন্তরে) কাটাচ্ছে তারা। কার্যত শৈশব গ্রাস করেছে করোনাভাইরাস। অনলাইন শিক্ষা আমদানি হলেও তা যে সকলের কাছে পৌঁছচ্ছে না তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল বিবিসি প্রকাশিত এক সমীক্ষায়।
আরও পড়ুন: 'ভ্যাকসিন দিন, ক্যাম্পাস খুলুন', দাবি নিয়ে বিক্ষোভে সামিল প্রেসিডেন্সির পড়ুয়ারা
শুধু স্পষ্ট হওয়া নয়, ওই সমীক্ষায় যে ছবি উঠে এসেছে তার অভিঘাত ভয়ঙ্কর ও সুদূরপ্রসারী বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাথমিক ও উচ্চ প্রথামিক স্কুলগুলি ১৭ মাস ধরে বন্ধ। প্রত্যন্ত এলাকা ও গ্রামগুলিতে ইন্টারনেট নেই, স্মার্টফোন নেই অধিকাংশ বাড়িতে। ফলে বহু বাচ্চা অনলাইন শিক্ষা কী জিনিস সেটাই জানে না। দেশের ১৫টি রাজ্যে ১৪০০ বাচ্চার উপরে সমীক্ষা চালিয়েছে। সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে গরিব অংশের ছাত্রছাত্রীদের ৮ শতাংশ ছাত্রছাত্রী অনলাইনে পড়াশোনার সুযোগ পায়। ৩৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনাই বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থাৎ মহামারী স্কুলের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে এই ছেলেমেয়েদের জন্য।
সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, অনলাইনে শিক্ষার হার শহরে ২৪ শতাংশ, গ্রামে ৮ শতাংশ। স্মার্টফোন আছে মফঃস্বলে ১৫ শতাংশের কাছে। প্রত্যন্ত গ্রামে তা ৯ শতাংশেরও কম। আবার যাদের কাছে অনলাইন শিক্ষার উপকরণ রয়েছে অর্থাৎ স্মার্ট ফোন বা ট্যাব তাদের কাছে যথাযথ ভাবে অনলাইন শিক্ষার স্টাডি মেটিরিয়াল পাঠাচ্ছে না স্কুলগুলি।
এই সমীক্ষকদল প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘরে ঘরে ঘুরে দেখেছে প্রত্যন্ত এলাকার বেশিরভাগ বাচ্চা ঠিকমতো পড়তেই পারে না। সঠিক ভাবে অক্ষরই চেনে না অনেক শিশু লিখতে সমস্যা হয় অনেকের। পরিস্থিতি যখন এমনই তখন বাবা-মায়েরাও বুঝতে পারছেন সঙ্কটের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। প্রত্যন্ত এলাকার অনেক বাবা-মা চাইছেন ৯০ শতাংশ অভিভাবক চান স্কুল খুলে যাক।
এই সমীক্ষা প্রসঙ্গে সমাজকর্মী তথা শিক্ষা গবেষক কুমার রানা বলেন, “খালি চোখে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে অবস্থা কতটা গুরুতর। এবং এর অভিঘাত ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী।” তাঁর কথায়, স্কুলে গিয়ে পড়া আর অনলাইন শিক্ষার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। একটা ছাত্রের মুখোমুখি শিক্ষকের ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে তাদের বেঞ্চ ভাগ করে নেওয়া, একস্পঙ্গে বসে মিড ডে মিল খাওয়া, স্কুলের মাঠে খেলা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্নেহশীল শাসন—এসবের মধ্যে মনস্তাত্বিক বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। সেটা না হলে একটি শিশুর যথাযথ বিকাশ সম্ভব নয়। প্রাথম স্কুলের ধারণাটাই হচ্ছে একসঙ্গে বাঁচার অভ্যেস তৈরি করা। সেটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে একাকিত্ব গ্রাস করছে শিশুদের।
কুমার রানা এও বলেন, আমাদের রাজ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। অনেক সময়ে দেখা যায় একটা বাচ্চা ক্লাস ফাইভে ভর্তি হচ্ছে অথচ সে সাধারণ জিনিস জানে না। তাকে শিখিয়ে তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু স্কুলহীন শৈশবের মননে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে তা পূরণ করা অসম্ভব। ফলে এই অভিঘাত সুদূরপ্রসারী।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'