
'বন্ধু’ ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য কার্বন ডাই অক্সাইড ও দূষিত গ্যাস - প্রতিকী ছবি ।
শেষ আপডেট: 19 April 2024 14:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এমন বন্ধু আর কে আছে! বিশ্ব উষ্ণায়ণ যখন গলায় পাথরের মতো চেপে বসেছে, পরিবেশ দূষণ খাঁড়া তুলে ধ্বংসলীলায় মেতেছে, তখন এমন একজন বন্ধু পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার বইকি! উপকারি ব্যাকটেরিয়া না বলে বরং একে ‘বন্ধু’ ব্যাকটেরিয়াই বলছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের বন্ধু, পরিবেশের বন্ধু। বিশ্ব পরিবেশ রক্ষায় এই ব্যাকটেরিয়াই আগামী দিনে বড় হাতিয়ার হতে চলেছে বিজ্ঞানীদের। জলবায়ুর বদলকে ভ্রুকুটি দেখাতে পারে এই বন্ধুই, এমনটাই দাবি বিজ্ঞানী থেকে পরিবেশবিদদের। এই ব্যাকটেরিয়ার নাম সকলেরই জানা ই কোলাই ( Escherichia coli ) । ব্যাকটেরিয়া সমাজে এই ই কোলাইরা সত্যিই সুশীল। এমনকি বিদ্বজ্জনও বলা চলে। বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে প্রিয় একোকোষী জীবাণু, যাকে নিয়ে সব থেকে বেশি গবেষণা হয়েছে বিগত ১৫০ বছর ধরে। কমবেশি খানদশেক নোবেল তো মিলেইছে ই কোলাই সংক্রান্ত গবেষণার কাজে। আরও একবার চমক দেখাতে চলেছে এই উপকারি ব্যাকটেরিয়ারা। তবে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ই কোলাই নয়। বরং তাদের আরও সভ্যভদ্র করে, আরও আপডেটেড-স্মার্ট বানিয়ে তবেই বাজারে ছেড়েছেন বিজ্ঞানীরা। মেকওভ্যার করা ই কোলাইরা হুহু করে কার্বন-ডাই অক্সাইড ছাড়ে না, বরং তারা এই গ্যাস টেনে নেয়। বদলে ফিরিয়ে দেয় জ্বালানি উপাদান। অনেকটা উদ্ভিদেরই মতো।

ই কোলাইদের স্বভাব-চরিত্রে এমন বদল থুরি মডিফিকেশন এনেছেন ইজরায়েলের ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের বিজ্ঞানীরা। ল্যাবে ২৫০ দিন ধরে ব্যাকটেরিয়াদের জিনে বদল ঘটিয়ে তাদের এমন পরিবেশ-বান্ধব করে তুলেছেন। ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষক শমুয়েল গ্লেইজ়ার বলেছেন, “এইসব অণুজীবেরা শর্করা খেয়েই অভ্যস্ত। প্রথমবার এদের ডায়েটে বদল আনা হয়েছে। এমনভাবে জিনোমে পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে যাতে তারা শর্করা থেকে মুখ ফিরিয়ে খালি কার্বন-ডাই অক্সাইডই শোষণ করতে পারে। তার বদলে তৈরি করতে পারে এমন জৈব উপাদান যা জ্বালানি বা শক্তি তৈরির কাজে লাগে।”
ই কোলাই গ্রাম নেগেটিভ, রড আকৃতির কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া। তারা শান্ত ও সুবোধ। চুপটি করে আমাদের খাদ্যনালীতে বাস করে। কিছু ই কোলাই ছাড়া বেশিরভাগই মানুষের বন্ধু। ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষক রন মিলো ই কোলাই সংক্রান্ত এই গবেষণার অন্যতম পথপ্রদর্শক। তিনি বলেছেন, পরিবর্তিত এই ই কোলাইরা যে কার্বন-ডাই অক্সাইড ছাড়ে না তা নয়, তবে মাত্রায় একেবারেই কম। বরং তারা গ্যাস-ডায়েটে অভ্যস্ত।

আমরা জানি উদ্ভিদরা হল অটোট্রফ। এরা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার জন্য কার্বন-ডাই অক্সাইড (অজৈব কার্বন) ব্যবহার করে, সায়ানোব্যাকটিরিয়াও তাই। তবে বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়াই হেটারোট্রফ। তারা জৈব উপাদান থেকেই বেঁচে থাকার শক্তি সংগ্রহ করে। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, কোনওভাবে যদি ব্যাকটেরিয়ার জিনে প্রয়োজনীয় বদল ঘটানো যায় তাহলে তারাও অটোট্রফের মতোই বাতাস থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড শুষে নেবে। প্রতিটি ই. কোলাইতে প্রায় ৪ হাজারের মতো জিন আছে। যেখানে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ায় জিনের সংখ্যা মাত্র কয়েকশ’। ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম ই. কোলাইয়ের ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করা হয়। দেখা গেছে ই. কোলাইয়ের বিভিন্ন স্ট্রেইনের মধ্যে ২০% জিনের মিল আছে। বাকি ৮০% মিল নেই। এ ৮০% মিউটেশন ও অন্য প্রজাতি থেকে জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে হয়েছে।

বিজ্ঞানী রন মিলো বলেছেন, উদ্ভিদ এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়ারা আলোর উপস্থিতিতে কার্বন-ডাই অক্সাইড দিয়ে নিজেদের খাবার তৈরি করে। তবে এই ই কোলাইদের তেমন কিছু দরকার পড়ে না। এরা সরাসরি কার্বন-ডাই অক্সাইড শুষে নিতে পারে। শর্করা থেকে আচমকা ডায়েটে এমন বদল ঘটানোর জন্য বিজ্ঞানীদের অবশ্য কম পরিশ্রম করতে হয়নি। প্রথম ২০০ দিন তাদের খেতে দেওয়া হয়েছে সামান্য শর্করা ও অনেকটা বেশি মাত্রায় কার্বন-ডাই অক্সাইড। দেখা গেছে ধীরে ধীরে তারা কার্বন-ডায়েটেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এবং পাকাপাকিভাবে তাদের কার্বন-খেকো করে তোলার জন্য জিনেও কিছু বদল ঘটানো হয়েছে। দেখা গেছে পরের ৩০০ দিন তারা শর্করার দিকে আর ফিরেও তাকায়নি। নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক সারগেন্ট জানিয়েছেন, এই মডিফায়েড ব্যাকটেরিয়াদের বিভাজন কম গতিতে হচ্ছে। সাধারণত দেখা যায় প্রতি ২০ মিনিটে ই কোলাইরা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু কার্বন-খেকো কোলাইদের বংশবৃদ্ধি করতে কখনও কখনও ১৮ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। তাই গবেষণা চালানো হচ্ছে কীভাবে আরও দ্রুত এই ব্যাকটেরিয়াদের বিভাজন ঘটানো যায়। যত দ্রুত এদের বংশবৃদ্ধি হবে, শক্তি উৎপাদনের জন্য ততটাই বেশি গতিতে কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে নেবে। ফ্র্যাঙ্ক আরও বলেছেন, চেষ্টা চলছে যাতে পরবর্তীকালে Renewable Energy দিয়ে এদের জীবনচক্র চালানো যায়। তাতে উদ্ভিদের মতোই এরা আরও বেশি পরিমাণে জ্বালানি খাদ্যের উপাদান তৈরি করবে।
বিজ্ঞানী রন মিলোর কথায়, বিশ্ব উষ্ণায়ণর রুখে মানবসভ্যতাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নাগরিক সভ্যতা গড়ে তুলতে যেভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, সবুজ ধ্বংস হচ্ছে, তাতে চড়চড়িয়ে বাড়ছে কার্বন-ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড। ক্ষতিকর গ্যাসের প্রভাব কমিয়ে বাতাসকে শুদ্ধ করতে কাজে লাগানো যেতে পারে এই মডিফায়েড ই কোলাইদের।