দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘যাঁরা নাসিরুদ্দিন শাহকে কুৎসিত ভাবে ব্যক্তি আক্রমণ করছে, তাদের লক্ষ্য ধর্মের নামে রাজনীতি করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি।’ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপে রাজস্থানের আজমীরে অভিনেতা নাসিরুদ্দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করা নিয়ে এইভাবেই প্রতিক্রিয়া দিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায়, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, অনীক দত্ত, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্টরা।
কদিন আগেই দেশ জুড়ে বাড়তে থাকা উগ্র হিন্দুত্বের আবহাওয়া নিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন। বলেছিলেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন। যদি তাঁর সন্তানদের ঘিরে ধরে উত্তেজিত জনতা? আর প্রশ্ন করে তোমরা হিন্দু না মুসলমান? তাহলে কী বলবে তারা?
কদিন আগেই বুলন্দসহরে গোহত্যার অভিযোগে খুন হয়েছেন পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিংহ। তার পরদিনই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডেকেছিলেন। উত্তরপ্রদেশ সরকার সূত্রে জানা গিয়েছিল, সেই বৈঠকে গোহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তারপর গোহত্যার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও এখন অবধি ফেরার সুবোধ কুমারের আততায়ীরা।
সেই প্রসঙ্গ টেনে নাসিরুদ্দিন বলেছিলেন, ‘একজন পুলিশ অফিসারের মৃত্যুর থেকেও এই দেশে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ গোহত্যা!’ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেছিলেন, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিষ। কিন্তু এই দৈত্যকে ফের বোতলে পুরে ফেলা খুবই কঠিন কাজ।
এর পরেই নাসিরুদ্দিনের সমালোচনায় গর্জে ওঠেন দেশের হিন্দুত্ববাদী শিবিরের একাংশ।
শুক্রবারে তাঁর নিজের স্কুল আজমেরে সেন্ট আনসেলম সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে এক সাহিত্য উৎসবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল নাসিরুদ্দিনের। কিন্তু সেখানে তাঁর তীব্র বিরোধিতা করে স্লোগান দিতে শুরু করে ভারতীয় জনতা যুব মোর্চা ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন।
শেষ অবধি, নাসিরুদ্দিনের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাঁর ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ বাতিল করেন উদ্যোক্তারা।
নবনির্বাণ সেনার প্রেসিডেন্ট অমিত জানি নাসিরুদ্দিনের জন্য পাকিস্তানের একটা ওয়ানওয়ে টিকিট কেটেছেন বলে জানা যায়। উত্তরপ্রদেশের বিজেপির চিফ মহেন্দ্রনাথ পাণ্ডে, নাসিরুদ্দিনের তুলনা করেন তাঁরই অভিনীত সরফরোশ ছবির পাকিস্তানি চরের সঙ্গে।
দেশজুড়ে নাসিরুদ্দিন শাহের বিরুদ্ধে চলা হিন্দুত্ববাদীদের এই প্রতিবাদেরই তীব্র নিন্দা করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। তাঁদের মতে, ‘গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের অভিনয়জগতে স্বতন্ত্র মর্যাদায় মন্ডিত এই বর্ষীয়ান শিল্পীকে আজ যেভাবে সাম্প্রদায়িক জিগির তুলে অপমান ও হেনস্থা করা হচ্ছে তা আমাদের দেশের সৃজনের ধারার সঙ্গে যুক্ত সকলের পক্ষে কলঙ্কজনক। বিভেদ ও অশান্তির বিরুদ্ধে সমাজজীবনে সুস্থতা ও প্রগতির স্বার্থে নাসিরুদ্দিনের বলিষ্ঠ কণ্ঠ বারবার দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছে। দেশটাকে বিভেদ আর দাঙ্গার অশান্তিতে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এরা দেশের শত্রুদের হাত শক্ত করতে চায়।’
এই বিবৃতিতে সই করেছেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী, নাট্য সমালোচক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলেশ্বর মুখার্জি, অনীক দত্ত, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, মেঘনাদ ভট্টাচার্য, অরুণ মুখোপাধ্যায়, অশোক মুখোপাধ্যায়, চন্দন সেন, বিকাশ ভট্টচার্য, চন্দন সেন, বাদশা মৈত্র, দেবদূত ঘোষ, বিমল চক্রবর্তী, সীমা মুখোপাধ্যায়, অসিত বসু, কুন্তল মুখোপাধ্যায়, শুভেন্দু মাইতি, সৌরভ পালধী, তূর্ণা দাশ, সংগ্রামজিৎ সেনগুপ্ত, দিলীপ চক্রবর্তী, ভদ্রা বসু ও মন্দাক্রান্তা সেন।