দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডেঙ্গি ভাইরাসদের (Dengue) মধ্যে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী। মশার লালা থেকে মানুষের শরীরে ঢুকে দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। সঠিক সময় চিকিৎসা না হলে মৃত্যু অবধারিত। এমনই ভয়ঙ্কর ডেঙ্গি ভাইরাস ছড়িয়েছে বাংলাদেশে। এখনই ২০ জন আক্রান্তের নমুনায় এই ভাইরাস চিহ্নিত করা গিয়েছে।
বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর) জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় এ বছরে ডেঙ্গির দাপট মারাত্মক বাংলাদেশে। কারণটাই হল ডেনভি-৩ ডেঙ্গি ভাইরাসের প্রকোপ। মনে করা হচ্ছে, এই ভাইরাস প্রচুর মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে। আপাতত ২০ জনের নমুনায় এর খোঁজ মিলেছে। তবে ডেনভি-৩ ভাইরাসে সংক্রমিতের সংখ্যা আরও বেশি বলেই মনে করা হচ্ছে। আক্রান্তদের রক্তে পাওয়া ভাইরাল স্ট্রেনের জিনোম সিকুয়েন্স বা জিনের গঠন বিন্যাস বের করে ভাইরাসের হালহকিকতের খোঁজ চালাচ্ছেন গবেষকরা। ডেনভি-৩ রূপ বদলেছে কিনা বা কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে, তা জানার জন্য পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে।

বিসিএসআইআরের রিপোর্ট বলছে, ইতিমধ্যেই ডেঙ্গি আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এই নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ জনে। তবে মৃতের শরীরে ডেনভি-৩ ভাইরাস আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এখনও।
ঢাকাতেও ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকার বাইরে সাতশো জনেরও বেশি ডেঙ্গিতে আক্রান্ত। সূত্রের খবর, শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে ডেনভি-৩ ভাইরাসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার লালার সঙ্গে ডেনভি-৩ শরীরে ঢুকে গেলে খুব তাড়াতাড়ি রোগ ছড়াতে পারে। এখন যে সমস্ত উপসর্গ দেখা যাচ্ছে তাতে বাচ্চাদের জ্বর অত বেশি হচ্ছে না, কিন্তু গাঁটে গাঁটে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। রক্তে প্লেটলেট বা অনুচক্রিকা কমে যাচ্ছে।
কী এই ডেনভি-৩?
ডেঙ্গির বাহক মশা, কিন্তু আসল কলকাঠি নাড়ে
ডেঙ্গু ভাইরাসরা (DENV)। এরা হল সিঙ্গল, পজিটিভ-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ ভাইরাস। ফ্ল্যাভিভিরিডি পরিবার ও ফ্ল্যাভিভাইরাস গণের এই ডেঙ্গি ভাইরাসের পরিবার অনেক বড়। এদের পাঁচ রকমের সেরোটাইপ আছে যারা প্রত্যেকেই ভয়ঙ্কর রোগ তৈরি করতে পারে।
স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই (aedes aegypti) মশা এই ভাইরাসদের বাহক। এরা আবার ইয়েলো ফিভার ভাইরাস, জিকা ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক।

ডেনভি ভাইরাসের চারটি ভ্যারিয়ান্টই সংক্রামক—ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪। এদের মধ্যে ডেনভি-৩ ভাইরাস অতি সংক্রামক। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে ডেনভি-৩ ভাইরাস চিহ্নিত করেন গবেষকরা। এর ভ্যারিয়ান্ট নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলেই সংক্রমণ ছড়ায়। কত দ্রুত মানুষের শরীরে এই ভাইরাস রোগ ছড়াতে পারে তা দেখতে একটা সময় ‘ডেনভি-৩ লাইভ হিউম্যান চ্যালেঞ্জ’ (DENV-3-LVHC) নামে ক্যাম্পেনও করা হয়েছিল। সেখানে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের রক্তের নমুনা নিয়ে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন বিজ্ঞানীরা।
বিসিএসআইআর জানাচ্ছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এই ডেঙ্গি ভাইরাসের প্রকোপ বেড়েছিল। ২০১৯ সালে মহামারীর মতো ছড়িয়েছিল ডেঙ্গি, তার জন্যও এই ভাইরাসই দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। সে বছর লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, মারা গিয়েছিলেন প্রায় ১৭৯ জন।
কীভাবে মানুষের শরীরে ছড়ায় ডেঙ্গি ভাইরাস?
স্ত্রী মশা পেটে এই ভাইরাস বহন করে। ভাইরাস আক্রান্ত শরীরের রক্ত খেলে সেখান থেকেও ভাইরাস বাসা বাঁধে মশার শরীরে। তবে, মশার উপরে এই ভাইরাসের ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে না। প্রায় ৮-১০ দিন পরে ভাইরাস মশার দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে ও মশার লালাগ্রন্থির মাধ্যমে লালাতে এসে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। ডেঙ্গি ভাইরাস বহনকারী মশা মানুষকে কামড়ালে লালার মধ্যে থাকা ভাইরাসরা চট করে ঢুকে যায় মানুষের রক্তে। সরাসরি ঢুকে পড়ে শ্বেত রক্তকোষে। সেই কোষগুলি যখন শরীরের ভিতর ঘুরেফিরে বেড়ায় তখন সেগুলির ভিতরে এই ভাইরাস প্রজনন চালিয়ে যায়। সংখ্যায় বাড়তে বাড়তে দেহের রোগ প্রতিরোধের দফারফা করে দেয়। যার প্রবাবেই সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা-সহ জ্বর, সঙ্গে বমি বমি ভাব, চোখের পিছনে ব্যথা এবং সারা শরীরে র্যাশ। ক্রনিক অসুখ আছে যাদের যেমন ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, অ্যানিমিয়া, টিবি আছে তাদের এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গি প্রাণঘাতী হতে পারে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'