দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাশিয়ার টিকা তথা ‘স্পুটনিক ভি’ মানুষের শরীরে সত্যিই কার্যকরী কিনা আগে সেটা যাচাই করতে হবে। সুরক্ষার বিষয়টাও মাথায় রাখা দরকার। টিকা দেওয়ার পরে শরীরে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা আগে সেটা পরীক্ষা করা দরকার, তারপরেই টিকা প্রয়োগের কথা ভাবা যাবে, বুধবার এমনটাই জানাল দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স (এইমস)।
বিশ্বজুড়ে যখন করোনার টিকা তৈরির হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা চলছে, তখন সবাইকে চমকে দিয়ে প্রথম ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দাবি করেছে রাশিয়া। এই টিকা কতটা সুরক্ষিত তার প্রমাণ দিতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ের শরীরেও ভ্যাকসিন ইনজেক্ট করা হয়েছে এবং কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কেবলমাত্র প্রথম স্তরের ট্রায়ালের পরেই টিকা কার্যকরী হয়েছে রাশিয়ার এমন দাবি নিয়েই ইতিমধ্যেই নানা তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। যদিও রাশিয়া দাবি করেছে ২০টি দেশ ইতিমধ্যেই টিকার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে রেখেছে। সেই সব দেশে রাশিয়ার টিকা উৎপাদনও হবে আবার বিতরণ করাও হবে। এই ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে ভারতও।
দিল্লি এইমসের ডিরেক্টর ডক্টর রণদীপ গুলেরিয়া বলেছেন, রাশিয়ার তৈরি টিকার সেফটি ট্রায়াল করা দরকার। রাশিয়া যদিও দাবি করেছে এই টিকার প্রয়োগে সাফল্য মিলেছে, তবুও মানুষের শরীরে এই টিকার প্রভাব কতটা সেটা পরীক্ষা করা উচিত। প্রথম স্তরের ট্রায়ালে ৭৬ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে ৩৮ জনকে ইঞ্জেকশন ও বাকিদের টিকার পাউডার দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। রাশিয়া দাবি করেছে, তারা দুই পর্যায়ের ট্রায়াল একসঙ্গে করেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের দুটি দলে ভাগ করে দুটি ভিন্ন ডোজ দিয়ে দেখা গেছে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে। ডক্টর গুলেরিয়া বলেছেন, রাশিয়ার দাবি যদি সত্যি হয় তাহলেও সার্বিকভাবে এই টিকা প্রয়োগের আগে তার ক্লিনিকাল ও সেফটি ট্রায়াল করে নেওয়া জরুরি। যদি দেখা যায় টিকার ডোজে শরীরে কোনও খারাপ প্রভাব পড়ছে না, তাহলেই পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য ভাবনা চিন্তা করা যাবে।
রাশিয়ায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে করোনার ভ্যাকসিন তৈরি করছে গামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব এপিডেমোলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি। অক্সফোর্ড ইউিনিভার্সিটি যে পদ্ধতিতে টিকা তৈরি করেছে সেই একই পদ্ধতিতে সর্দি-কাশির ভাইরাস অ্যাডেনোভাইরাসের স্ট্রেন নিষ্ক্রিয় করে তার সঙ্গে করোনার স্পাইক প্রোটিন মিলিয়ে ভেক্টর ভ্যাকসিন তৈরি করেছে রাশিয়া। গামেলিয়ার ডিরেক্টর অলেক্সান্ডার গিন্টসবার্গ বলেছেন করোনার যে আরএনএ প্রোটিন স্ক্রিনিং করা হয়েছে তাকে আগে নিষ্ক্রিয় করে নেওয়া হয়েছে বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে, যাতে এই ভাইরাল স্ট্রেন শরীরে ঢুকলে প্রতিলিপি তৈরি করে সংখ্যায় না বাড়তে পারে। তাই এই টিকা শরীরে ঢুকলে কোনও খারাপ প্রভাব ফেলবে না, বরং বি-কোষকে সক্রিয় করে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে, পাশাপাশি টি-কোষকে অ্যাকটিভ করে ইমিউন সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করবে।
বিশ্বের ১৬০ রকম ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে এখনও অবধি ৬টি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে। তৃতীয় স্তরের ভ্যাকসিন ট্রায়ালে রয়েছে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রজেনেকা, আমেরিকার মোডার্না, চিনের সিনোভ্যাক। এদের মধ্যে মোডার্না ও অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনে আশার আলো দেখেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। তবে রাশিয়ার তৈরি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে অনেকেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার জানিয়েছেন, করোনা টিকার প্রতিটি পর্যায়ের ট্রায়ালের গুরুত্ব রয়েছে। প্রথম দুই স্তর শুধুমাত্র মানুষের শরীরে টিকার সুরক্ষার বিষয়টা নিশ্চিত করে, তৃতীয় স্তরে দশ হাজারের বেশি জনকে টিকা দিয়ে দেখা হয় সার্বিকভাবে এর প্রয়োগ সম্ভব কিনা। এই স্তরে সব বয়সের মানুষের উপর টিকার ট্রায়াল হয়। তারপরেই টিকা বাজারে আনা যাবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাশিয়া এতগুলো স্তর পার না করেই টিকা নিয়ে আসার ঘোষণা করে দিয়েছে। জার্মানির ভাইরোলজিস্ট পিটার ক্রেমসনার বলেছেন, ভ্যাকসিনকে কার্যকরী ঘোষণা করার আগে বহু মানুষের উপর তার প্রভাব কেমন সেই রিপোর্ট সামনে আনতে হয়। প্রথম স্তরের ট্রায়ালের রিপোর্ট এখনও সবিস্তারে সামনে আনেনি রাশিয়া। তাই এই টিকা কতটা সুরক্ষিত এবং মানুষের শরীরে আগামী দিনে কোনও খারাপ প্রভাব ফেলবে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।