শেষ আপডেট: 2 December 2019 12:10
আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা। ঠিক এই তারিখটাই, ২ ডিসেম্বর। অন্য সব শীতের রাতের মতোই ঘুম নেমে এসেছিল মধ্যপ্রদেশের ভোপাল শহরের ঘরে ঘরে। আসন্ন বিপর্যয়ের কণামাত্র টের পাননি কেউ। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকা শহরের বাতাসে আচমকা ছড়িয়ে পড়েছিল বিষ।
‘ইউনিয়ন কার্বাইড’ কারখানার একটি প্লান্টে জমা করা মিথাইল আইসোসায়ানেটের ট্যাঙ্কে কোনও ভাবে মিশে যায় জল। শুরু হয়ে যায় মারাত্মক রাসায়নিক বিক্রিয়া। ভয়ঙ্কর পরিমাণে উৎপন্ন হতে থাকে কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড-সহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস। বিক্রিয়ার ভয়ঙ্কর তাপ ও চাপে ট্যাঙ্ক খুলে প্রায় ৪০ মেট্রিক টন মারণ মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে।
বাকিটা ইতিহাস।
গতকাল, রবিবার ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করে, প্রশাসনের গাফিলতির প্রতিবাদে অভিশপ্ত সেই গ্যাস কারখানাটির চার পাশে মানবশৃঙ্খল গড়ে তোলেন ভোপালবাসী। তাঁদের অভিযোগ, ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি পেলেও কোনও প্রতিকার পাননি আজও। এমনকী সেই দুর্ঘটনার পর এলাকায় ছড়িয়ে পরা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থও সাফ হয়নি এখনও।
স্থানীয়দের বক্তব্য, ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না করলেও, এ সবের মধ্যে কিন্তু স্মৃতিসৌধ বানাতে ভোলেনি মধ্যপ্রদেশ সরকার। আসলে এ সবই ক্ষতিগ্রস্তদের মূল দাবি থেকে নজর ঘোরানোর ছল বলে অভিযোগ ভোপালবাসীর।
তদন্তে জানা গেছিল, সে দিনের সেই দুর্ঘটনার পিছনে কর্তৃপক্ষের অসতর্কতার দায় ছিল পুরোমাত্রায়। বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য রাখা হত বড় বড় ট্যাঙ্কে। ছোট ট্যাঙ্কে রাখলে বিপদের মাত্রা কম হতো। অনেক দিন ধরে ক্ষয়ে যাচ্ছিল কারখানার পাইপলাইনও। বিপর্যয় ঘটার পরেও তা মোকাবিলা করার ব্যাপারে গাফিলতি থেকে গেছিল। কিন্তু তদন্তের চার্জশিট জমা পড়লেও, কোনও এক অজানা কারণে বহু বছর ধরে মামলা চলতে থাকে। শেষমেশ কোনও সাজাও হয়নি ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার তৎকালীন মালিক ওয়ারেন অ্যাণ্ডারসনের। বছর পাঁচেক আগে মারা যান তিনি। চাপা পড়ে যায় দুর্ঘটনার বহু তথ্য।
সরকারি তথ্য বলছে, ১৯৮৪ সালের এই ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল ৩ হাজার ৭৮৭ জনের। কিন্তু বেসরকারি সূত্রে দাবি, মৃতের আসল সংখ্যাটা এর কয়েক গুণ বেশি। শুধু তাই নয়। মৃত্যুর হাত থেকে যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সাড়ে পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পঙ্গু হয়ে যান প্রায় চার হাজার মানুষ। এবং তার চেয়েও বড় কথা, বিপর্যয়ের পরে সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও, আজও ওই বিষাক্ত গ্যাসের বলি হচ্ছে অনেকেই। অসুস্থতা নিয়ে জন্মাচ্ছে বহু শিশু। পঙ্গুত্বের অভিশাপ বহন করছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।