চৈতালী চক্রবর্তী
কার্নিভাল চলছে মহাশূন্যে। নেচেই চলেছে ব্ল্যাক হোল। নাচতে নাচতে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে উপরে-নীচে, ডাইনে-বাঁয়ে। লালচে-কমলা-হলদেটে আলোর ছটায় জমে উঠেছে কনসার্ট। কান পেতে শুনে তাল মেলাল নাসার
গড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার (
Goddard Space Flight Center)।
ব্ল্যাক হোল তো নয়, ঠিক যেন একটা কমলালেবু। রিঙের মতো খোলস ছেড়ে নেচে চলেছে। গনগনে আলোর স্রোত তাকে ঘিরে চক্রাকারে পাক দিচ্ছে। ছন্দে ছন্দে ঘুরছে সেই সব আলোর রিং। তাড়াতাড়িও নয়, আবার ঢিমে তালেও নয়। তাদের ঘোরার ছন্দে একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি হচ্ছে মহাশূন্যে।
গড্ডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানী জেরেমি স্কিনিটম্যান জানিয়েছেন, এই ব্ল্যাক হোল রাক্ষুসে পেটুক নয়। তারা গিলে খাওয়া এর ধাতে নেই। বরং নাচ-গানেই এর মন বেশি। আলোর ওই রিং গুলো আসলে গ্যাসের স্তর। প্রতিটার গতি প্রায় আলোর গতির সমান। ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে
(Orbit) ওরা আলোর বিকিরণ ঘটিয়ে চলেছে।
https://twitter.com/NASA/status/1177025023867006976
স্টিফেন হকিং বলে গিয়েছিলেন নাচুনে ব্ল্যাক হোলরা আলো উগড়ে দেয়
১৯৭০ সালে হকিং দাবি করেছিলেন, কৃষ্ণগহ্বরের নিজস্ব তাপমাত্রা আছে। আছে কণাদের অস্থিরতার পরিমাপ বা ‘এনট্রপি’। কৃষ্ণগহ্বর থেকে যে আলো ঠিকরে বেরোয় সেটা কোয়ান্টাম কণা
(হকিং রেডিয়েশন)। এই আলো ছড়াতে ছড়াতেই একসময় কৃষ্ণগহ্বরের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ মহাশূন্যে মিলিয়ে যায় ব্ল্যাক হোল। তৈরি হয় একটা বড় শূন্যস্থান।

হকিং আরও বলেছিলেন, এক্স রশ্মি বা গামা রশ্মি নয়, দৃশ্যমান আলোও বেরিয়ে আসতে পারে ব্ল্যাক হোল থেকে। আর সেই আলো এতটাই জোরালো যে, কুড়ি সেন্টিমিটার ব্যাসের টেলিস্কোপ দিয়ে এই পৃথিবী থেকেই দেখা যায়। ব্ল্যাক হোল থেকে যে আলো বার হয় সেটা আসলে
ফোটন ও গ্র্যাভিটন (বিজ্ঞানীদের কল্পনায় গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ কণা)। এই কণাগুলো এক হয়ে মিলেমিশে ব্ল্যাক হোলের বাইরে নরম রেশমের মতো আলোর রিং তৈরি করে। মৃত্যুর আগে ব্ল্যাক হোলের এই বিশেষ দিক নিয়েই গবেষণা করছিলেন হকিং। যদিও অনেক বিজ্ঞানীরই দাবি হকিং-এর এই তত্ত্ব ‘
কোয়ান্টাম মেকানিকস’-এর নিয়ম-নীতির বিরোধী।
ব্ল্যাক হোলকে ঘিরে ডিস্কো-লাইট
‘ভি-৪০৪ সিগনি’ নামে বাইনারি সিস্টেমে (পৃথিবী থেকে সাত হাজার আটশো আলোকবর্ষ দূরে দু’টি তারার একটি নক্ষত্রমণ্ডল) খুব ভারী একটি ব্ল্যাক হোলের খোঁজ পেয়েছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সেই ব্ল্যাক হোলটি ছিল সূর্যের চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশি ভারী। সেও একই ভাবে দৃশ্যমান আলোর বিকিরণ করত। নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, যে নক্ষত্রমণ্ডলের মধ্যে ব্ল্যাক হোলরা সাধারণত ঘাপটি মেরে থাকে, তাদের চারপাশে সবসময় একটা গ্যাসের স্তর থাকে। ব্ল্যাক হোলের জোরালো অভিকর্ষের টানে সেই গ্যাসের একটা বড় অংশ ও মহাজাগতিক ধুলোবালি এসে পড়ে ব্ল্যাক হোলের পাঁচিল-
‘ইভেন্ট হরাইজনে’র (Event Horizon) বাইরের অংশ
‘অ্যাক্রিশন ডিস্কে’ (Accretion disk)। আর তখনই জন্ম হয় দৃশ্যমান আলোর। এত দিন মনে করা হত ব্ল্যাক হোল শুধু আলো শুষে নেয়, তবে দেখা যাচ্ছে কিছু হাসিখুশি ব্ল্যাক হোল আবার আলো ছড়িয়ে দিতেও ভালোবাসে।
পড়তে ভুলবেন না
