
শেষ আপডেট: 4 August 2020 18:30
যাওয়া নদীর ফসিল আছে। চমকে উঠেছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। তারপর থেকে অনেক অভিযান হয়েছে। কখনও মঙ্গলের পাড়ায় উঁকি দিয়েছে অরবিটার, কখনও অনাহুত অতিথির মতো মঙ্গলের ঘরেই পা রেখেছে রোভার। ১৯৯৭ সালে নাসার পাথফাইন্ডার রোভার থেকে শুরু করে স্পিরিট, অপরচুনিটি ও কিউরিওসিটি হয়ে, কুড়িতে সবচেয়ে আধুনিক ও সবচেয়ে বড় মঙ্গল-অভিযান নাসার ‘পারসিভিয়ারেন্স’।
৩০ জুলাই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মঙ্গলের দিকে উড়ে গেছে পারসিভিয়ারেন্স। আসলে পারসিভিয়ারেন্স শুধু মঙ্গলযান নয়, এর সঙ্গে জুড়ে আছে আরও বৃহৎ পরিকল্পনা। মঙ্গলের সেই অজানা দিক দেখবে পারসিভিয়ারেন্স যা এর আগে কেউ কখনও দেখার কথা ভাবেনি। মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিক খুলে যাবে। নাসার এই ‘মার্স মিশন’ (Mars Mission 2020)নিয়ে এত হইচই কেন? পারসিভিয়ারেন্স রোভারের বৈশিষ্ট্য কী? মিস কিউরিওসিটি রোভারের থেকে কতটা আলাদা এই পারসিভিয়ারেন্স? মঙ্গলের ঘরে কী কাজ করতে যাচ্ছে সে? কোন লক্ষ্যের কথা বলছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা ? এই সব প্রশ্নের উত্তরই সহজভাবে লিখলেন নাসার প্ল্যানেটারি সায়েন্টিস্ট, মার্স রোভার মিশনের অন্যতম বিজ্ঞানী ডক্টর অমিতাভ ঘোষ। ১৯৯৭ সালে নাসার পাথফাইন্ডার মার্স মিশনের গবেষক ছিলেন অমিতাভবাবু। নাসার একাধিক মঙ্গল অভিযানের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
[caption id="attachment_246941" align="aligncenter" width="675"]
পারসিভিয়ারেন্স রোভার[/caption]
অজানা জায়গায় যাচ্ছে তাই পারসিভিয়ারেন্সকে সুরক্ষার বর্ম পরিয়েই পাঠানো হয়েছে। কনিকাল ব্যাকশেল ও হিট শিল্ডের আবরণ আছে রোভারের। মঙ্গলের মাটিতে কাজ করার জন্য এনার্জি চাই, সেই শক্তি আসবে মাল্টি-মিশন রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (MMRTG)থেকে । মঙ্গলের পিঠে খনিজ উপাদান নিরিখ-পরখ করার জন্য রোভারে রয়েছে Mastcam-Z ক্যামেরা সিস্টেম, তাপমাত্রা, বায়ুর গতি ও বায়ুর অভিমুখ, চাপ-আর্দ্রতা মাপার জন্য MEDA সেন্সর। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ভেঙে অক্সিজেনে রূপান্তরিত করার যন্ত্র MOXIE, কিউরিওসিটিতে এই বিশেষ যন্ত্রটি নেই। পারসিভিয়ারেন্স রোভারের PIXL এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করবে, RIMFAX রাডার মঙ্গলের মাটির ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দেখবে ও তার ম্যাপ তৈরি করবে। তাছাড়াও রোভারে থাকছে SHERLOC স্পেকট্রোমিটার, লেসার, ক্যামেরা, সুপারক্যাম যা মঙ্গলের মাটির চরিত্র বুঝবে, ক্যামেরায় মাঙ্গলিক শিলার ছবি তুলবে।
স্কাইক্রেন ল্যান্ডিং[/caption]
মঙ্গলের পরিমণ্ডলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই রোভারের তাপমাত্রা থাকবে ২১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি। এই অধিক তাপ থেকে রোভারের যন্ত্রপাতিকে রক্ষা করবে হিট শিল্ড। রোভার যখন ধীরে ধীরে নামতে শুরু করবে, মঙ্গলের পিঠ থেকে ঠিক ১১ কিলোমিটার উপরে থাকবে তখন এর প্যারাশুট খুলে যাবে। হেভি পে-লোড নিয়ে গতিবেগ একটু একটু করে কমবে। ২০৯৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা থেকে (১৩০৪ মাইল/ঘণ্টা) বেগ কমে দাঁড়াবে প্রতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার (২০০ মাইল/ঘণ্টা)। মাটি ছোঁয়ার আগে এর আট রেট্রোরকেট জ্বলে উঠবে। ‘স্কাইক্রেন টাচডাউন সিস্টেম‘ অ্যাকটিভেট হবে। ধীরে ধীরে মঙ্গলের মাটি ছোঁবে রোভার।
পারসিভিয়ারেন্স মিশনে জমিয়ে রাখা মঙ্গলের মাটি, পাথর পরের বারের মঙ্গলযাত্রায় পৃথিবীতে বয়ে আনবে নাসার রোভার।
এবার রোভারের সঙ্গে মঙ্গলে যাবে ‘ইনজেনুইটি মার্স হেলিকপ্টার’ । চার কার্বন-ফাইবার ব্লেড যুক্ত থাকবে দুটি রোটরের সঙ্গে, ঘুড়বে ২৪০০ আরপিএম-এ। রোভারের পেটের সঙ্গে জোড়া থাকবে এই হেলিকপ্টার। ইনজেনুইটি পারসিভিয়ারেন্সের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। এর আগে মঙ্গল-অভিযানে রোভারের সঙ্গে এমন কোনও এয়ারক্রাফ্ট জুড়ে দেওয়া হয়নি। আগেই বলেছি, মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর থেকে অনেক পাতলা। তাই রোভারকে একজায়গা থেকে অন্যজায়গায় খুব দ্রুত পৌঁছে দেবে এই হেলিকপ্টার। এটা অনেকটা পৃথিবীর ড্রোনের মতো।
রোভার যখন অনেক স্যাম্পেল জোগাড় করে একজায়গা থেকে অন্যজায়গায় যেতে চাইবে তখন এই হেলিকপ্টার সাহায্য করবে। কারণ মঙ্গলের মাটি তো পৃথিবীর মতো নয়, এখানে রুক্ষ পাহাড়ি উপত্যকা, গিরিখাত রয়েছে। সেইসব পেরিয়ে রোভারকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই এয়ারক্রাফ্ট। পারসিভিয়ারেন্সের সঙ্গে প্রথম মিশনে ইনজেনুইটির টেস্ট-ফ্লাইট হবে। এই মিশন সফল হলে পরবর্তীকালে অন্যান্য মহাকাশ অভিযানে এমন হেলিকপ্টার পাঠাব আমরা।
[caption id="attachment_246949" align="aligncenter" width="593"]
ইনজেনুইটি মার্স হেলিকপ্টার[/caption]
এবার আসছি পারসিভিয়ারেন্স মিশনের লক্ষ্য কী কী। কুড়ির এই মঙ্গল-অভিযানের সাফল্যের উপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে। এই মিশন সফল হলে ভবিষ্যতে মঙ্গলযাত্রা আরও সহজ ও কম খরচে হবে, পাশাপাশি, রহস্যময় লাল গ্রহের প্রাণে অস্তিত্বের যে খোঁজ চলছে দীর্ঘ এত বছর ধরে তাতেও আশার আলো দেখতে পাব আমরা।
জেজ়েরো ক্রেটার[/caption]
এই ক্রেটারকে বলা হয় মঙ্গলের ডেল্টা। মনে করা হয় এখানে একসময় বড় বড় নদী বয়ে যেত। ক্রেটারের মাটিতেও জলের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। আর যেখানে জল, সেখানে প্রাণের জন্ম হওয়া স্বাভাবিক। কোটি কোটি বছর আগে যখন নদীরা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, তখন এখানে আনুবীক্ষণিক জীবদের জন্ম হয়েছিল বলেই মনে করা হয়। পারসিভিয়ারেন্স এই ক্রেটারে ঘুরে ঘুরেই সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণের খোঁজ করবে। এখানকার মাটি পাঠাবে পৃথিবীতে।
মেরিনার-৯ অরবিটার মঙ্গলের দরজা খুলে দিয়েছিল। পাথফাইন্ডার, স্পিরিট, অপরচুনিটি দেখিয়েছিল তার অন্দরমহল। কিউরিওসিটি বলেছিল সেই দুনিয়াও পৃথিবীরই মতো, সেখানেও ঋতু বদলায়, ফুঁসে ওঠে আগ্নেয়গিরি, দিন-রাত হয়। এতদিন শুধু পরিচয় পর্ব চলেছে। চেনাশোনার পালা চুকেছে। এবার একেবারে গভীরে ঢুকে রহস্যের শিকড় খুঁজে বার করবে পারসিভিয়ারেন্স। মঙ্গলেও একসময় প্রাণ ধুকপুক করত, এই খোঁজ যদি মেলে তাহলে মহাকাশবিজ্ঞানে আরও এক নতুন অধ্যায় তৈরি হবে। বিজ্ঞানীদের কাছে এখন এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আর এই লক্ষ্যপূরণের গুরুদায়িত্বই রয়েছে পারসিভিয়ারেন্স রোভারের।
ছবি সৌজন্যে: নাসা
নাসার জেট প্রোপালসন ল্যাবরেটরি