
শেষ আপডেট: 8 July 2020 18:30
নাসার কিউরিওসিটি রোভারের তোলা গ্রিনহেগ পেগমেন্টের ছবি
তার কৌতুহলী ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মঙ্গলের সেই বিখ্যাত ‘গ্রিনহেগ পেডিমেন্ট’ এবং গেডিজ ভ্যালিস (GV) । উত্তরে শার্প পাহাড় যাকে বলে মাউন্ট শার্পের পাদদেশে এই নীচু ভূমি বা গিরিখাত রয়েছে। পাথুড়ে জমি, দেখে মনে হবে শক্ত মাটিকে ভাঁজে ভাঁজে মুড়ে ফেলা হয়েছে। দেড় কিলোমিটারেরও বেশি চক্কর কেটে এই গিরিখাতের নানা অ্যাঙ্গেলের ছবি তুলেছে কিউরিওসিটি।
https://twitter.com/NASA/status/1281015964990148615
গেল ক্রেটারের উপর মাউন্ট শার্পও মঙ্গলের এক বিস্ময়। এর গঠন মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণীকে। ঠিক যেন পাহাড়ের পাদদেশে একটা হ্রদ রয়েছে, পাহাড়ের পাথুড়ে গা বেয়ে নেমে আসছে ঝর্না, চারপাশে ঘন হয়ে মেঘ জমেছে। এইসব কিছুই নেই, কিন্তু পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে যেন তার ছাপ রয়ে গেছে। জন্মলগ্নে কি তেমন কিছু ছিল মঙ্গলে, এই পাহাড় সেই রহস্যকেই উস্কে দেয়। গবেষকরা বলেন, লাল গ্রহের জন্মলগ্নের অনেক অজানা রহস্যের সমাধান হতে পারে এখান থেকেই।
পাহাড় পেরিয়ে কিউরিওসিটি রোভার থেমেছে ‘সালফেট-বিয়ারিং ইউনিট’-এ। জিপসাম ও এপসম সল্টের বিস্তৃত জমি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সালফেটের এই বিস্তৃত জমিই বলে দেবে আজ থেকে ৩০০ কোটি বছর আগে জলবায়ুর বদল কীভাবে হয়েছিল।
কিউরিওসিটি রোভারের প্রতি পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে নাসার জেট প্রপালসন ল্যাবোরেটরি। পৃথিবী থেকে কিউরিওসিটিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন ম্যাট গিল্ডনার। প্রতি ঘণ্টায় ৮২ থেকে ৩৩৮ ফুট (২৫ থেকে ১০০ মিটিরা) বেগে ছুটছে কিউরিওসিটি। ম্যাট বলেছেন, গ্রিনহেগ পেডিমেন্টের প্রতিটি ধাপে ছড়িয়ে রয়েছে রহস্য। কোথাও প্রায় ৯৬ মাইল এলাকা জুড়ে হ্রদের মতো বিরাট এলাকা রয়েছে। এখানকার মাটির প্রকৃতি জানান দেয়, কখনও হয়ত বিশাল জলাশয় ছিল এই উপত্যকায়। কোনও অজানা কারণে পরে সেটা অদৃশ্য হয়। ওই এলাকার মাটি পরীক্ষা করে তেমনটাই জানিয়েছে নাসার কিউরিওসিটি।
[caption id="attachment_238198" align="aligncenter" width="699"]
মাউন্ট শার্প[/caption]
কিউরিওসিটি। মঙ্গলে এক সময় ছিল বড় বড় নদী। কম করে ১৭ হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের।‘লাল গ্রহে’র উত্তর গোলার্ধে ‘অ্যারাবিয়া টেরা’র (Arabia Terra) সুবিস্তীর্ণ এলাকায় ওই সব বড় বড় নদীর ‘ফসিল’-এর হদিশ মিলেছে। বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধে ‘অ্যারাবিয়া টেরা’য় প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বইত বড় বড় নদী। অ্যারাবিয়া টেরার মতোই সুবিশাল গিরিখাত ভেলস মেরিনারিস— লাল গ্রহের এই গিরিখাত (Grand Canyon) ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২০০ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং ৭ কিলোমিটার গভীর।
[caption id="attachment_238199" align="alignnone" width="1200"]
রোভারের চোখে ধরা পড়েছে মঙ্গলের ওয়েসিস[/caption]
পৃথিবীর দিন-রাতের আয়ু যতটা, মঙ্গলের দিন-রাতের আয়ুও প্রায় ততটাই। নাসা জানিয়েছে, পৃথিবী নিজের কক্ষপথে একবার পাক খেতে যে সময় নেয় (২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট), তার চেয়ে সামান্য কিছুটা বেশি সময় নেয় লাল গ্রহ। ঘণ্টার হিসেবে তাই মঙ্গলের একটি দিন (দিন ও রাত মিলে) আমাদের চেয়ে সামান্য একটু বড়। তার দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট থেকে ২৪ ঘণ্টা ৩৯ মিনিটের মধ্যে। এটাকে বলে ‘সল’।
নাসার পাঠানো রোভার ‘মিস কিউরিওসিটি’ এখন যেখানে রয়েছে, তার ধারেকাছেই মঙ্গলের বিষূবরেখায় ‘এলিসিয়াম প্লানিশিয়া’ এলাকায় রয়েছে নাসার আরও এক মহাকাশযান ইনসাইট। মঙ্গলের মাটি খুঁড়ে সেও অমূল্য রত্নের সন্ধান করে যাচ্ছে। নাসা জানিয়েছে, মঙ্গলে ভূমিকম্প হয়। থরথর করে কেঁপে ওঠে মাটি। বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘মার্শকোয়েক’। এই ভূমিকম্পের কম্পন ধরা পড়ে ইনসাইটের সিস যন্ত্রে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে মোট ১৭৪ বার ‘মার্সকোয়েক’ ধরা পড়েছে ইনসাইটের সিস যন্ত্রে। যার মধ্যে ২০টি কম্পনের মাত্রা ছিল ৩ থেকে ৪। সাড়ে চারশোরও বেশি সিসমিক সিগন্যাল ধরা পড়েছে যা কম্পনের প্রমাণ দেয়। নাসা বলছে এর মধ্যেই ফের কেঁপেছে মঙ্গলের মাটি। সিস যন্ত্র দেখিয়েছে সেই কম্পনের মাত্রা অন্তত ৪.০।
এই কম্পনের উৎসস্থল রয়েছে মঙ্গলের মাটির নীচে ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গভীরতায়। পৃথিবীর মতো মঙ্গলে টেকটোনিক প্লেট নেই যাদের ধাক্কাধাক্কিতে ভূমিকম্প হবে। সেখানে ক্রাস্টের বালিকণার নড়াচড়ার ফলেই তৈরি হয় কম্পন। এটাই মার্সকোয়েক।