
শেষ আপডেট: 11 August 2023 12:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চের (Supreme Court Constitution Bench) রায় খারিজ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner) নিয়োগে কেন্দ্রের হাতেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রাখতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সরকার। অথচ দশ বছর আগে লালকৃষ্ণ আডবাণীই এই সুপারিশ করেছিলেন। বর্ষীয়ান বিজেপি নেতার দাবি ছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ে যে কমিটি তৈরি হবে তাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে রাখা হোক। তাতে কমিশনের নিরপক্ষেতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চও সেই মর্মেই রায় দিয়েছিল। কিন্তু এখন মোদী সরকার চাইছেই রায়কে খারিজ করে এমন ব্যবস্থা করতে যাতে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সরকারের মতই প্রাধান্য পায়।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে খারিজ করতে সরকার যে বিল সংসদে পেশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, সিলেকশন কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত দ্বিতীয় কোনও মন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে ওই তিন জনের কমিটিতে রাখা হবে না। পরিবর্তে সরকারেরই এক জন মন্ত্রী থাকবেন। যার স্পষ্ট অর্থ হল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ে কেন্দ্রের সরকারের অধিকার নিরঙ্কুশ থাকবে। বিরোধী দলনেতা বড়জোর ডিসেন্ট নোট দিতে পারবেন, তার অতিরিক্ত ক্ষমতা তাঁর থাকবে না।
বাংলায় পঞ্চায়েত ভোটের আগে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ করা হয়েছিল প্রাক্তন মুখ্য সচিব রাজীব সিনহাকে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনার হিসাবে রাজীব সিনহার ভূমিকা, তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে পঞ্চায়েত ভোট চলাকালীন বারবার প্রশ্ন উঠেছে। বাম, কংগ্রেস, বিজেপি সমষ্টিগত ভাবে অভিযোগ করেছেন যে রাজীব সিনহা শাসক দলের কথা শুনে কাজ করছেন। তাঁর ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস ও কলকাতা হাইকোর্টও।
অধীর চৌধুরী এদিন বোঝাতে চান, মোদী সরকার যা ব্যবস্থা করছে তাতে আগামী দিনে রাজীব সিনহার মতো কেউ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে এসে বসবেন। এর পর কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ থাকবে।
রাজ্য নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ে ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের মতই প্রাধান্য পায়। সংবিধানে সেই নিয়মই লেখা রয়েছে। সেই সুযোগ নিয়েই রাজ্য সরকার তিন জন অফিসারের নাম রাজভবনে পাঠালেও প্রথম পছন্দ হিসাবে রাজীবের নাম রেখেছিল। তাতেই সম্মতি দিতে হয়েছিল রাজ্যপালকে।
কিন্তু দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিষয়টি সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত বলেই জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কে এম জোসেফের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ।
২০১২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লিখে লালকৃষ্ণ আডবাণীও বলেছিলেন যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান পদে কাউকে নিয়োগ করতে গেলে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা চালু করা হোক। অর্থাৎ তাতে সরকারের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা যেন না থাকে। তা নিশ্চিত করতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত তিন সদস্যের কমিটির অন্যতম সদস্য করা হোক সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে। এদিন কংগ্রেস আডবাণীর ওই চিঠির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছে মোদী সরকারকে।
বস্তুত কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী জমানায় নির্বাচন কমিশনের উপর সরকারের প্রভাব বিস্তার নিয়ে বার বার অভিযোগ উঠেছে। কমিশন আদৌ নিরপেক্ষ কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। বাংলায় একুশের নির্বাচন হয়েছিল আট দফায়। তখনও কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাই গত মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বেঞ্চ যখন রায় ঘোষণা করেছিল তখন স্বাগত জানিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। টুইট করে তিনি বলেছিলেন, “সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়ে (landmark judgment) গণতন্ত্রের জয় হল”। মমতা এও বলেছিলেন, অত্যাচারী শক্তির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে জনগণের ইচ্ছাই বিরাজ করছে!
কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে পাশ কাটাতে সরকার নতুন বিল আনায় মমতাও অসন্তুষ্ট। এ ব্যাপারে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে আলোচনা চাইছে তৃণমূল। কংগ্রেসও তাতে রাজি। ওই বিল নিয়ে সরকার বিরোধিতায় নবীন পট্টনায়েক, জগন্মোহন রেড্ডি, চন্দ্রশেখর রাওদেরও সামিল করানোর চেষ্টা হচ্ছে। যাতে লোকসভায় না হোক রাজ্যসভায় বিলটি আটকে দেওয়া যায়।