দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুম্বই কি তবে হার্ড ইমিউনিটির পথে যেতে চলেছে? তেমনই সম্ভাবনার কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশে হার্ড ইমিউনিটি দিয়ে করোনা অতিমহামারীকে যে পুরোপুরি কাবু করা সম্ভব নয়, সে কথা আগেই জানিয়েছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রক। তবে মুম্বইয়ে যেভাবে সংক্রমণ বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছে এবং সেরে ওঠাদের শরীরে ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, তাতে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আরও জোরালো হচ্ছে।
জুলাই মাস থেকেই মুম্বইয়ে সেরো সার্ভে চালাচ্ছে
টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR) । সেরো সার্ভে হল এমন একটি পরীক্ষা যেখানে রক্তে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি ও তার পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। এই সার্ভে করলেই বোঝা যায় কতজনের মধ্যে জীবাণু প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এই হিসেব থেকে স্পষ্ট হয় কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় ঠিক কতজন ভাইরাস সংক্রামিত হয়েছিলেন। টাটা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বলছেন, মুম্বইয়ের বস্তি এলাকাগুলিতেই অন্তত ৮০ শতাংশের শরীরে করোনা প্রতিরোধী অ্যান্টিবডির খোঁজ মিলেছে। অর্থাৎ একটা বড় অংশের মানুষ ভাইরাস সংক্রামিত হয়েছিলেন এবং সেরেও উঠেছেন। আর বস্তি এলাকা বাদে প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষের রক্তে মিলেছে করোনার অ্যান্টিবডি।
দেশে করোনা আক্রান্ত রাজ্যগুলির মধ্যে মহারাষ্ট্রই শীর্ষে। মুম্বইতেই সংক্রামিতের সংখ্যা লক্ষাধিক। গবেষকরা বলছেন, সামনেই দিওয়ালির উৎসব আসছে। যদি মেলামেশায় লাগাম পরানো না যায় তাহলে সংক্রমণের গ্রাফ চড়চড় করে বাড়বে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বাড়বে। তবে ইতিবাচক দিক হল, যদি বেশি সংখ্যক মানুষ সংক্রমণ সারিয়ে উঠতে পারেন তাহলে রোগ প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হবে একটা বড় অংশের মধ্যে। সংক্রমণ আর বেশিজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। তৈরি হবে হার্ড ইমিউনিটি। আর তারই দৌলতে সংক্রমণ বৃদ্ধির হারও কমবে। আগামী বছরের গোড়া থেকেই এই হার্ড ইমিউনিটি তৈরির লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
হার্ড ইমিউনিটি কী?
হার্ড (Herd) মানে হল জনগোষ্ঠী এবং
ইমিউনিটি (Immunity) মানে হল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। সহজভাবে বলতে গেলে, যদি জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগের মধ্যে রোগ-জীবাণুকে প্রতিরোধ করার মতো শক্তি বা ইমিউন পাওয়ার তৈরি হয়, তাহলে বাকিরাও সংক্রমণের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়, একেই বলে হার্ড ইমিউনিটি।

আরও সহজ করে বলতে গেলে, ধরা যাক, আপনি সংক্রামিত হননি বা আপনার শরীরে ভাইরাস ছড়ায়নি। কিন্তু আপনার আশপাশের কিছু মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়েছ। এবার টিকা নিয়ে হোক বা পরোক্ষে জীবাণু সংক্রমণের মাধ্যমে হোক, সেইসব মানুষ যদি সেরে ওঠেন এবং তাঁদের শরীরে ভাইরাসকে হারিয়ে দেওয়ার মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে তাহলে সুরক্ষিত থাকবেন আপনিও। অর্থাৎ আপনি যাদের সঙ্গে মেলামেশা করছেন তাঁদের থেকে রোগ ছড়াবার সম্ভাবনা আর থাকবে না।

এই হার্ড ইমিউনিটিকে বলে ‘কমিউনিটি ইমিউনিটি’ (
community immunity) বা ‘পপুলেশন ইমিউনিটি’ (
population immunity) বা ‘সোশ্যাল ইমিউনিটি’ (
social immunity)। গবেষকরা বলছেন, কোনও গোষ্ঠী বা ক্লাস্টারের মধ্যে যদি বেশিরভাগ মানুষই ইমিউনড হয়ে যান, তাহলে স্বভাবতই ভাইরাস আর এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। ভাইরাল ট্রান্সমিশন না হলে সংক্রমণের ছড়িয়ে পড়ার হারও কমবে। হিউম্যান ট্রান্সমিশনের (Human Transmission) শৃঙ্খলটা ভেঙে যাবে। একটা সময় দেখা যাবে, ভাইরাল স্ট্রেন আর জিনের গঠন বদলাতে পারছে না। কারণ বহু মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার রাস্তাটাই বন্ধ হয়ে গেছে। যে মুহূর্ত থেকে ভাইরাল স্ট্রেনে মিউটেশন বা জিনের গঠন বিন্যাস বদলানো বন্ধ হবে, সেই মুহূর্ত থেকেই ভাইরাল স্ট্রেন নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করবে। মহামারীর প্রকোপ কমবে। ১৯৭৭ সালে স্মলপক্স, ১৯৩০-এ হামের সময়ও ঠিক এভাবেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছিল। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীর সময়েও ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল বহু মানুষের শরীরে।
এই হার্ড ইমিউনিটির একটা থ্রেশহোল্ড (
herd immunity threshold) আছে। ঠিক কতজন মানুষের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধী শক্তি তৈরি হলে বাকিদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর হার কমবে সেটা নির্ভর করে দেশের আয়তন, জনসংখ্যার উপর। এই হার্ড ইমিউনিটি আসতে পারে টিকাকরণের মাধ্যমে বা পরোক্ষে জীবাণু সংক্রমণ ঘটিয়ে। ভারতের মতো দেশে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে গেলে ৭০ শতাংশের মধ্যে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটাতে হবে যা প্রায় অসম্ভব। কারণ এতে মৃত্যুহার বাড়বে। তাই টিকাকরণই একমাত্র উপায়। যদি একটা বড় অংশের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায় তাহলে সংক্রমণের হার কমার আশা দেখা যাবে। গবেষকরা বলছেন, ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি
(Immunodeficiency) রয়েছে যাদের, অর্থাৎ ওষুধের মাধ্যমে ইমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব নয়, সে সমস্ত মানুষদের সুরক্ষিত রাখবে হার্ড ইমিউনিটি। তবে ভারতে এখনই পুরোপুরি হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হলেও পার্শিয়াল হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হতে পারে বলেই দাবি টাটা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের। পোলিও, হাম, বা জলবসন্তের মতো পুরোপুরি সুরক্ষা না পেলেও কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে সে ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন গবেষকরা।