দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিগত ২৪ বছর একটি ভালো কথাও একজন আর একজনের সম্পর্কে ভুল করেও বলে ফেলননি। সৌহার্দ্য তো দূরস্থান তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক অহি–নকুলের থেকেও শত্রুতামূলক ছিল। সেই দুজনই আজ এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরস্পরকে দরাজ দিলে সার্টিফিকেট দিয়ে গেলেন। একজন তাঁর সমর্থকদের বললেন, নেত্রী এতটাই শ্রদ্ধেয় যে তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করা উচিত। নির্বাচনী লড়াইয়ে না থাকলেও সৌজন্য প্রদর্শনের লড়াইয়ে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নন নেত্রীও। তিনি বললেন, নেতা প্রধানমন্ত্রীর মতো ভুয়ো নেতা নন, 'পিছড়ে বর্গ'–এর খাঁটি নেতা। অলক্ষ্যে অন্তর্যামী হাসলেন কিনা জানা না গেলেও মইনপুরির জনসভায় উপস্থিত মহাজোটের সমর্থকদের মুখে যে হাসি ফুটল তা বলাই বাহুল্য।
চলতি লোকসভা নির্বাচনে মইনপুরি কেন্দ্রে মহাজোট প্রার্থীর সমর্থনে ডাকা জনসভায় আজ মায়াবতী তাঁর একদা শত্রু মুলায়ম সিং কে সমর্থন করার আবেদন জানিয়ে বলেন, ''কোনও কোনও সময়ে দেশের দিকে তাকিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মুলায়ম সিং যাদবজি বিগত বছরগুলিতে নিজেকে অনেক বদলে ফেলেছেন, সমাজবাদী পার্টির শাসনকালে তিনি সাধারণ মানুষ বিশেষ করে মহিলাদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করেছেন।'' এই পুনর্মিলন সভায় বসপা সভাপতি আরও বলেন, ''মুলায়ম সিংজি প্রধানমন্ত্রীর মতো পশ্চাদপদ শ্রেণির ঝুটো নেতা নন।'' আশির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা 'নেতাজি' তাঁর ভাষণে উপস্থিত সমাজবাদী পার্টির সমর্থকদের নেত্রীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে বলে জানান, ''আমরা মায়াবতীজিকে স্বাগত জানাচ্ছি, আমি চিরকালই ওনাকে শ্রদ্ধা করে এসেছি।''
সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টির ১৯৯৩ সালে তৈরি হওয়া 'সুসম্পর্ক' ভেঙে যায় ১৯৯৫ সালে। ওই বছরেই ঘটে ভারতীয় রাজনীতির কুখ্যাত 'গেস্টহাউস কাণ্ড'। তারপরের ২৪ বছরের ইতিহাস সপা–বসপা'র শত্রুতার ইতিহাস। এর মধ্যে দুই নেতা–নেত্রীরই জীবনে ঘটে গিয়েছে নানা উত্থানপতন। মুলায়ম কিছুটা বয়েসের ভারে কিছুটা দল ও পরিবারের চাপে নিজেরই তৈরি দলে অন্তরালে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে উঠে এসেছেন পুত্র অখিলেশ যাদব। পুরনো দাপট হারিয়ে নানা আইনি মামলায় জর্জরিত 'বহেনজি'ও রক্ষণাত্মক হতে বাধ্য হয়েছেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ায় যখন 'ভাইপো' অখিলেশ পুরনো তিক্ততা ভুলে জোট বাঁধার প্রস্তাব দেন, সেই প্রস্তাব অস্বীকার করার 'হারিকিরি' 'পিসি' মায়াবতী সঙ্গত কারণেই করেননি। ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। ২০১৮ সালের উপ নির্বাচনে পিসি–ভাইপো'র জোট বিজেপি'র দুর্গে ঝড় তুলে ছিনিয়ে নিয়েছে কৈরানা, গোরখপুর, ফুলপুরের আসন। সেই সাফল্যই ছিল চলতি লোকসভা নির্বাচনের জোট বাঁধার সূচনা।
মুলায়ম সিং যাদব যদিও প্রথম থেকেই এই জোটের বিরোধিতা করে গিয়েছেন এবং দলের মধ্যে প্রকাশ্যেই বলেছেন যে এই জোটের ফলে সমাজবাদী পার্টির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠবে। যদিও তাঁর দীর্ঘ দিনের শক্ত ঘাঁটি মইনপুরা থেকে প্রার্থী হতে আপত্তি জানাননি তিনি কিন্তু বিগত সপা–বসপা'র তিনটির একটিতেও তিনি উপস্থিত হননি শরীরের কারণ দেখিয়ে। জনমানসে তাঁর প্রভাবের কথা বিবেচনা করেই অখিলেশ যাদব প্রায় মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন আজকের সভায় দলের 'নেতাজি'কে উপস্থিত করার জন্য। স্বাভাবিক ভাবেই মুলায়ম সিং–এর জনসভায় শেষ পর্যন্ত আসবেন কিনা তা নিয়ে চূড়ান্ত কৌতূহল তৈরি হয়েছিল সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। অবশেষে তিনি এলেন। দীর্ঘদিনের শত্রুর পাশে বসলেন, হাসলেন এবং হয়তো অখিলেশকে বুঝিয়ে গেলেন এখনও পর্যন্ত পুত্রের সিদ্ধান্তের মান্যতা নির্ভর করে তাঁর সিলমোহরের ওপর।