দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা সংক্রমণে নাকের গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা চলে যাচ্ছে। মুখের স্বাদ হারাচ্ছেন অনেক করোনা রোগীই। গবেষকরা বলছেন, এগুলো হল প্রাথমিক রিস্ক ফ্যাক্টর। ভাইরাল লোড যদি বেশি হয় অর্থাৎ সংক্রমণ যদি শরীরে বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তার প্রভাব যেমন পড়ছে হৃদপিণ্ডে, তেমনি মস্তিষ্ক বা ব্রেনে। স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হতেও দেখা গেছে অনেক রোগীকে।
‘দ্য ল্যানসেট’ মেডিক্যাল জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, ৫৫ শতাংশ করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সংক্রামিত হওয়ার তিনমাসের মধ্যে নিউরোজিক্যাল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হয়েছে রোগী। অনেকের আবার হ্যালুসিনেশন হয়েছে, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিনাশের শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, ভাইরাসের সংক্রমণে এই উপসর্গগুলো দেখা দিচ্ছে যা চিন্তার কারণ। তবে আতঙ্ক না করে সতর্ক হওয়া উচিত। করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এলেই ‘ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্স ইমেজিং’ বা এমআরআই স্ক্যান করিয়ে নেওয়া উচিত। রোগ শুরুতে ধরা পড়লে চিকিৎসায় সারানো সম্ভব।
ল্যানসেটের নতুন গবেষণায় কী দেখা গেছে
৬০ জন করোনা রোগীর উপরে পরীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। বলা হয়েছে, সংক্রমণের তিনমাসের মাথায় রোগীদের মস্তিষ্কে নানারকম বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে, ‘সেরিব্রাল মাইক্রো-স্ট্রাকচারাল চেঞ্জ’ । এই ৬০ জন রোগীর মধ্যে কয়েকজন অ্যাকিউট ডিসেমিনেটেড এনসেফ্যালোমায়েলিটিস (Adem) রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এটি মস্তিষ্কের এক জটিল রোগ যেখানে তীব্র প্রদাহ হয়। গবেষকদের দাবি, করোনা সংক্রমণের সঙ্গেই মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর এই জটিল রোগের সম্পর্ক রয়েছে। কারণ যে রোগীদের উপর পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, তাদের স্নায়বিক রোগের কোনও উপসর্গ আগে ছিল না। নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার দেখা গেছে সংক্রমণের পরেই।
কী কী উপসর্গ দেখে সতর্ক হতে হবে
‘অ্যালঝাইমার্স ডিজিজ’ সায়েন্স জার্নালে একটি গবেষণার রিপোর্ট সামনে এনেছিলেন নিউরোলজিস্টরা। কোভিড সংক্রমণে কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি হচ্ছে বা হতে পারে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে সেখানে। নিউরোলজিস্টরা বলছেন, ফুসফুসের এপিথেলিয়াল কোষকে নষ্ট করে দিচ্ছে ভাইরাস। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রক্রিয়া বাধা পাচ্ছে। মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যার কারণে ‘ব্রেন ড্যামেজ’হচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন, গন্ধ ও স্বাদ চলে যাওয়াও এর প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। কারণ শরীরের স্নায়ু কোষ (Olfactory Cells) জেগে উঠেই মস্তিষ্কে বার্তা পৌঁছে দেয়। গন্ধের যে অনুভূতি সেটা এই কোষ বাহিত হয়েই ব্রেনে পৌঁছয়। মারণ ভাইরাস এই সিস্টেমকেই নষ্ট করে দেয়। ফলে গন্ধ নিতে পারার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারাতে থাকে রোগীরা। এই রোগকেই বলে অ্যানোসমিয়া (Anosmia) । স্বাদকোরকের ক্ষমতা চলে যাওয়া বা স্বাদহীনতা রোগ অ্যাগিউসিয়া (Ageusia)–র কারণও সেই একই।
করোনার নতুন উপসর্গগুলির মধ্যে মানসিক অবসাদ, ভুল বকা, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ইত্যাদিরও উল্লেখ করেছেন নিউরোলজিস্টরা। গবেষণায় দেখা গেছে, এরও কারণ হতে পারে সাইটোকাইন প্রোটিনের মাত্রাতিরিক্ত ক্ষরণ এবং রক্ত চলাচল বাধা পাওয়া। মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছনো বন্ধ হলে বা রক্ত জমাট বাঁধলে তীব্র প্রদাহ হচ্ছে, যার থেকে স্মৃতিনাশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।