
শেষ আপডেট: 25 May 2019 10:59
আর কয়েক ঘণ্টা পরেই দমদম বিমানবন্দরে এসে পৌঁছবে কুন্তল কাঁড়ার ও বিপ্লব বৈদ্যের কফিনবন্দি দেহ। কয়েক দিন আগে তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা। বাংলার পর্বতারোহণ মহলকে আরও একটা বড় ধাক্কার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাঁরা পাড়ি দিয়েছেন না-ফেরার দেশে। তাঁদেরই এক জন, বিপ্লব বৈদ্য। ২০১৪ সালে চিনের দিক থেকে, নর্থ কল দিয়ে এভারেস্ট আরোহণ করেন তিনি এবং দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। শুধু ক্লাইম্বিং পার্টনার হিসেবে নয়, এক জন বন্ধু হিসেবেও বিপ্লবের কাছের মানুষ ছিলেন দেবব্রত। আজ, বিপ্লবের মৃত্যুর ১০ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরে, দেহ শহরে এসে পৌঁছনোর আগে, তাঁর সঙ্গে পার করা সময়ের কথাই ভাগ করে নিলেন পর্বতারোহী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়।
চেষ্টা করছি খবরটা হজম করার, সত্যি বলতে কী, এত দিনেও পারছি না। পাঁচটা বছর আগে, ২০১৪ সালে ঠিক এই দিনেই একসঙ্গে এভারেস্ট ছুঁয়েছিলাম আমরা। চিনের দিক থেকে, নর্থ কল দিয়ে। গোটা সময়টার প্রতিটা মুহূর্ত আমার মনে আছে আজও। সে দিন শুনলাম, কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ আরোহণের পরেই যখন ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তখন রুদ্রকে বলে, বিভোক করে (খোলা আকাশের নীচে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করে) থেকে যাবে। রুদ্র ওকে ধমক দিয়ে, জোর করে নামায়।
আমার চকিতে মনে পড়ে গেল পাঁচ বছর আগের এই দিনটার কথা কথা। ওর এই একই ক্লান্তি আমিও দেখেছিলাম। এই একই রকম অবসন্নতা। এই একই দিনে, ২৫ মে। সামিট করে যখন আমরা নামব, ও অনেকটা ক্লান্ত আর অবসন্ন। তুমুল হাওয়া তখন, চার পাশে হোয়াইট আউট। বিপ্লবের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম আমি। আমাদের অক্সিজেন শেষ হতে চলেছে। ঠান্ডায় ফ্রস্ট বাইট শুরু হয়েছে বিপ্লবের। ক্লান্ত পদক্ষেপই বলে দিচ্ছে, ওর ক্ষমতা ফুরিয়ে এসেছে। তখন ঠিক একই কথা বলেছিল আমায়। “এখানে থেকে গেলে হয় না দেবুদা?”
থেকেই গেল। এ ভাবে!
সেই বার এভারেস্ট সামিটের পরে ওকে নিয়ে নেমে আসার গল্প দীর্ঘ। ফেরার পরে এ নিয়ে বহু আলোচনাও হয়। বিপ্লব হয়তো একটু মনঃক্ষুণ্ণও হয়েছিল, কেন আমি ওর কমতি বা খামতির কথা বলছি তাই ভেবে। কিন্তু এটা তো পাহাড়। যে কোনও সমস্যা, যে কোনও মুহূর্তে, যে কোনও কারও হতে পারে। সেটা এড়িয়ে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আলোচনা ও সতর্কতাই বেশি জরুরি।
তবে ২০১৪ সালের এভারেস্ট অভিযানের পরে বিপ্লবকে আমার সঙ্গী হিসেবে সকলে চিনলেও, আমাদের পরিচিতি বা বন্ধুত্ব তারও বছর চারেক আগে থেকে। শুশুনিয়া পাহাড়ের একটা রক ক্লাইম্বিং কোর্সে আলাপ হওয়ার পরে, আমরা বেশ কিছু অভিযান করি। তার মধ্যে অন্যতম ছিল রুদ্রগয়রা ও চৌখাম্বা কল।
তার পরে এই এভারেস্ট। নয় নয় করে সব মিলিয়ে মাস তিনেকের বেশি সময়ই হবে, আমি কাটিয়েছি বিপ্লবের সঙ্গে। কত কত নির্ঘুম রাত, একই টেন্টে, পাশাপাশি স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে আলোচনা করেছি পরের দিনের শিডিউল নিয়ে। কত কত ঘুমন্ত রাতের শেষে সকালে উঠে ঝগড়া করেছি পরস্পরের নাকডাকা নিয়ে।
পাহাড়ের বাইরের রোজকার সামতলিক জীবনে আমার খুব বেশি দেখা হতো না বিপ্লবের সঙ্গে। কিন্তু এটা আমি জানতাম, ও পাহাড়ের অভিযানে যতটা সিরিয়াস, নিজের অফিসের কাজেও ততটাই। অনেক বারই এমন হয়েছে, ওকে ফোন করতে শুনেছি অফিসে, কাউকে হয়তো কাজের কথা বলছে বা কোনও নির্দেশ দিচ্ছে কাজ নিয়ে।
এ সবের বাইরে অনেকেই জানে না, ও কত ভাল ফোটোগ্রাফার ছিল। কত ভাল রাঁধতে পারত ও! পাহাড়ে ওর হাতে রান্না খেয়েছি আমরা অনেক বার।
আমার মনে পড়ছে, পাঁচ বছর আগে যখন আমরা একসঙ্গে এভারেস্ট থেকে ফিরলাম। কত আনন্দ নিয়ে কত মানুষ এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য। কত মালা, মিষ্টি, অভিনন্দন উপচে পড়েছিল। ওই দিনটা আমি কখনও ভুলব না। আজকেও বিপ্লব ফিরছে ওই একই এয়ারপোর্টে। কিন্তু আজ আর কোথাও কোনও হাসি নেই, আনন্দ নেই।
আমি... আমি যাব না। আমি কফিনে করে ফেরা বন্ধুকে রিসিভ করতে যেতেই পারব না। সে মনের জোর আমার নেই। বিপ্লব ভাল থাকুক যেখানেই থাকুক। আকাশ ছুঁয়ে থাকুক।