দ্য ওয়াল ব্যুরো: অনাস্থা প্রস্তাবের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন রাহুল গান্ধী। তারপর মোদীর আসনের কাছে এসে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁকে। এত সবের পরেও সবার জানাই ছিল অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হবে না লোকসভায়। হলও তাই। ধ্বনি ভোটে ৩২৫-১২৬ এ পরাস্ত হল নরেন্দ্র মোদীর সরকারে বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা।
তার আগে, প্রায় দু’ঘন্টার জবাবী ভাষণের সিংহভাগ জুড়ে রাহুলকেই বিদ্ধ করলেন মোদী। বারবার কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন পরিবারতন্ত্রের এবং দুর্নীতির।
রাহুলের দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরার প্রসঙ্গে মোদী বললেন, এখনও পরবর্তী নির্বাচন হয়নি। সেই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। অথচ তবু সংসদের এক সদস্য দৌড়ে এসে প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, ‘ওঠ, ওঠ, ওঠ।’ এতই তাড়া তাঁর ক্ষমতায় আসার। আমি তাঁকে বলতে চাই যে দেশের মানুষই ঠিক করে কে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসবে।
রাহুলের ‘মোদী চৌকিদার নয় ভাগিদার’ মন্তব্যেরও জবাব দিলেন মোদী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়। বললেন, ‘আমি চৌকিদারও আমি ভাগিদারও, তবে আমি সওদাগর বা ঠিকাদার নই।’ তাঁর বক্তব্য তিনি দেশের মানুষের দুঃখ কষ্টের ভাগিদার।
রাহুল বলেছিলেন, ‘গোটা দেশ দেখছে প্রধানমন্ত্রী আমার চোখে চোখ রাখতে পারছে না।’ প্রত্যুত্তরে পরিবারতন্ত্র নিয়ে খোঁচা মেরে মোদী বললেন, রাহুল নামদার আর তিনি গরিব মায়ের সন্তান, দেশের পিছিয়ে পড়া পরিবারে জন্মানো কামদার। ফলে রাহুলের চোখে চোখ রাখার সাহসই নেই তাঁর। একই সঙ্গে চরণ সিংহ, মোরারজি দেশাই থেকে সুভাষ চন্দ্র বোস বা বল্লভভাই পটেলের নাম নিয়ে মোদী কংগ্রেসে গান্ধী পরিবারের একাধিপত্যকে আক্রমণও করেন। একই সঙ্গে সংসদের রাহুলের চোখ টেপা নিয়েও ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বললেন, ‘চোখে চোখ রাখার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন যিনি, তাঁর নিজের চোখ দিয়ে করা অসভ্যতা দেখেছে গোটা দেশ।’
রাফায়েল ডিল নিয়ে করা কংগ্রেস সভাপতির অভিযোগ নিয়েও উত্তর দেন মোদী। তাঁর মন্তব্য, পার্লামেন্টে একজনের শিশুসুলভ আচরণের জন্য দু’টো দেশকে আজ জবাবদিহি করতে হল। ডোকলাম প্রসঙ্গ নিয়েও তাঁর বক্তব্য, দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত এইসব বিষয় নিয়ে শিশুসুলভ আচরণ করা ঠিক নয়।
সার্জিকাল স্ট্রাইক এবং রাহুলের আনা জুমলার অভিযোগকেও তাঁর ভাষণে টেনে আনেন মোদী। বলেন, সার্জিকাল স্ট্রাইককে জুমলা বলা আসলে দেশের সেনাবাহিনীকেই অপমান করা।
মোদী আরও মনে করিয়ে দেন, যে ইউপিএ সরকারের আমলেই পেট্রল ও পেট্রল জাত পণ্যকে জিএসটি থেকে বাইরে রাখা হয়েছিল। ফলে এই ব্যাপারে বর্তমান সরকারকে আক্রমণ করা অর্থহীন।
তবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় অভিযোগ করেন মোদী ব্যাঙ্কের এনপিএ বা না ফেরত পাওয়া লোন নিয়ে। তিনি জানান, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৬০ বছরে মোট ১৮ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল ব্যাঙ্কগুলো। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে, ইউপিএর আমলে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৫২ লক্ষ কোটি টাকার। তাঁর অভিযোগ ওই সময় পছন্দের ব্যবসাদারদের ফোন করে ঋণ পাইয়ে দিতেন কংগ্রেসি নেতারা। আর সেই জন্যই বর্তমানে দেশে ব্যাঙ্কগুলোর এত খারাপ হাল।
তাঁর সরকারের সাফল্যের দীর্ঘ খতিয়ান দিয়ে মোদী আরও বলেন, এই অনাস্থা প্রস্তাব আসলে বিরোধীদের নেতিবাচক রাজনীতির পরিচয় দিচ্ছে। তাঁদের না আছে দেশের উন্নয়নের ওপর আস্থা, না আছে দেশের বিচারব্যবস্থা বা নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা। এই প্রসঙ্গে ইভিএম নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগকে বিদ্ধ করেন মোদী। ব্যঙ্গ করেন সুপ্রিম কোর্টে তাঁর সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে তোলা বিরোধীদের অভিযোগেরও। বিরোধীরা তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে আবার অনাস্থা প্রস্তাব আনার মতো শক্তি পান, এমন বলে শ্লেষও করেন মোদী।
তেলুগু দেশম পার্টির তোলা অন্ধ্রের বঞ্চনার অভিযোগও মোদী ঠেলে দেন কংগ্রেসের ওপরেই। বলেন, বাজপেয়ির আমলেও ঝাড়খণ্ড, উত্ত্রাখণ্ড বা ছত্তিশগড়ের মতো ছোট রাজ্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের কোনও অভিযোগ ছিল না। ‘স্পেশাল স্টেটাস’ নিয়ে তেলুগু দেশম এখন রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য স্পেশাল স্টেটাসের বদলে স্পেশাল প্যাকেজ যে ভালো সে কথা চন্দ্রবাবু নাইডু নিজের মুখেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন ওয়াই এস চন্দ্রশেখর রেড্ডির রাজনীতিতে আটকে গিয়েছে তেলুগু দেশম। ফলে আসন্ন নির্বাচনের আগে এই নিয়ে সংসদে রাজনীতি করছে তাঁরা।
স্বভাবসিদ্ধ শ্লেষ, বারবার কংগ্রেসকে আক্রমণ করে মোদী যতই মোদীতে থাকুন না কেন, তাঁর এই বক্তৃতা নিয়ে আক্রমণ করতে ছাড়ছেন না বিরোধীরা।
কংগ্রেসের সঞ্জয় ঝা টুইট করে লেখেন, প্রধানমন্ত্রী একটাও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধুই বাগাড়ম্বর করে যাচ্ছেন।
সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরিও টুইটারে লেখেন, গোটা ভারতবর্ষ মোদীর রাজত্বে ভুগছে। শুধু নিজের প্রচারেই প্রধানমন্ত্রী খরচ করেছেন চার হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা।