দ্য ওয়াল ব্যুরো: নীলগিরি পাহাড়ের কোলে অবস্থিত সোলার রেনফরেস্টে কাটিয়েছেন নিজের যৌবনকাল। জন্ম ও বড় হওয়া তামিলনাড়ুতে। জীবনের বেশিরভাগ সময়টা কাটিয়েছেন বনাঞ্চলে। নিজেও প্রচুর গাছ লাগান এবং তাঁদের যত্ন করেন। তাঁর ঘন ঘন বনাঞ্চল পরিদর্শন করতে আসাই তাঁকে পরিচিত করে বনবিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তিনি পি শিবকুমার, ওরফে মিস্টার কাজিরাঙা।
এখন কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের ডিরেক্টর তিনি।
তবে শুরুর গল্পটা মোটেও এরকম ছিল না। শিবকুমার যখন ক্লাস এইটের ছাত্র, তখন আর্থিক অনটনের কারণে বাবা-মা শিবকুমারের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। শিবকুমার বলেন, "আমার বাবা-মা বনবিভাগে মজুরের কাজ করে কোনওরকমে সংসার চালাতেন। আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য মা বাবা নিজেদের দুর্ভাগ্যকে দুষতেন। কিন্তু সে সময় বনাঞ্চলের অফিসাররাই আমাদের পাশে দাঁড়ান।"

অফিসাররা তাঁকে প্রেরণা জুগিয়েছেন এই কঠিন লড়াইটাতে জয়ী হওয়ার জন্য। সেই সঙ্গে দিয়েছেন সৎ পরামর্শও! তাঁদের উপদেশ কাজে লাগিয়েই তিনি নিজের খরচ চালানোর জন্য পার্টটাইম চাকরি করার কথা ভাবেন। শিবকুমার বন দফতরে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করেন প্রথমে, ফোন বুথ, প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করেন। সেই সঙ্গে টিউশনি করাও শুরু করেন।
৪৬ বছর বয়সি শিবকুমার বলেন, "আমি বনের মধ্যে যেতাম, অফিসারদের নমস্কার করতাম। জানাতাম, তাঁদের জন্যই বন সুরক্ষিত। প্রায়ই আমায় চকোলেট দিতেন তাঁরা। বন সম্পর্কে আরও বেশি করে শিখতে, জানতে উৎসাহিত হতাম সেই থেকেই। এর পরে ১৯৯৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের মনোজ কুমারকে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বনাঞ্চলের প্রতি আমার ভালবাসাকে স্বীকৃতি দেন। আমাকে পরামর্শ দেন আমি যেন বনবিভাগে যোগ দিই।"

এর পরে 'ফরেস্ট কলেজ অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট', মেটুপালায়ম থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ২০০০ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে ভারতীয় বন পরিষেবা বিভাগে চাকরি পান। স্বপ্ন যেন সত্যি হল।
আসাম ক্যাডারে দুই বছর প্রবেশনারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরে, শিবকুমার ২০০২ সালে তেজপুরে বনাঞ্চলে সহকারী সংরক্ষণের পদে যোগদান করেন। তখন থেকেই তিনি স্থানীয় পশুপ্রাণীর বহু প্রজাতি রক্ষা করছেন। পূর্বঘাটের বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর রক্ষার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন তিনি। তিনি ডিগবয়ের কাছে ২৫০টি প্রজাতির গাছকে শনাক্ত করেন ও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করেন। ২০০৯ সালে তাঁর কাজের প্রশংসা করে তাঁকে জাতীয় বনজ পুরস্কার দেয় বিশ্বব্যাঙ্ক।

বন সংরক্ষণ এবং সম্প্রদায়ের জীবিকা নির্বাহের বাইরেও শিবকুমার গণ্ডারদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বহু দিন ধরে। তিনি বলেন, "এখানে অনেক গণ্ডার শিকার হতো আগে। লাওখোয়া অঞ্চলে এখন প্রায় বিলুপ্তই হয়ে গেছে গণ্ডার। আমরা চেষ্টা করছি গণ্ডারদের বংশবৃদ্ধি করে তাদের সংখ্যা বাড়াতে। এছাড়াও চোরাশিকারিদের থেকে তাদের রক্ষা করা দরকার, তাহলেই বাঁচিয়ে রাখা যাবে বাকিদের।"
খুব যত্ন সহকারে তাঁরা কাজ করেছেন। প্রাণী সংরক্ষণ ও তাদের উন্নয়নের কাজ চলছে পুরোদমে। ২০০৯ সাল থেকেই বহু পর্যটক এখানে আসা শুরু করেছেন। সমীক্ষাতে দেখা গেছে কাজিরাঙাতে ২০১৯ সালে আট হাজার পর্যটক আসেন। ২০২০ সালে একমাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনকেও আসতে দেখা গেছে।

বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য মানুষকে সচেতন করতে তিনি জনসভাও করেন একাধিক। বন সংরক্ষণের প্রধান এবং কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের পরিচালক হিসাবে সে সব জায়গায় মানুষকে সচেতন করেন তিনি। ২০১৯ সালের পরে অবশ্য করোনার কারণে থমকে আছে সে সব। গত দুই বছরে তিনি বন্যজীবনের জন্য ছ'টি জলাভূমি তৈরি করেছেন, বিশেষত হাতি, গণ্ডার এবং বুনো মহিষের জন্য।
২০২০ সালে, শিবকুমার স্থানীয়দের কাছ থেকে মিঃ কাজিরাঙা একটি নতুন উপাধি অর্জন করেন। এর কারণও আছে বিশেষ। বন্যপ্রাণীদের থাকার জায়গা আরও বাড়ানোর যে সরকারি আদেশ, তাকে বাস্তবে কার্যকরী করেন তিনি। ৪৩০ বর্গ কিমি থেকে ৯০০ বর্গ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত হয় অরণ্য এলাকা। সরকারি সিলমোহর পড়ার পরে ইউনেস্কোর সাইটে এ সম্প্রসারিত এলাকার কথা যোগও হয়।

১৯০৮ সালে কাজিরাঙাকে সংরক্ষিত বন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এর পরে ১৯১৬ সালে এটি অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে বনটি একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে মর্যাদা পায়। এর পরে ১৯৮৫ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তকমাও পায়। বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি ১৯৭৪ সাল থেকে একটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ২০০৭ সালে এখানে একটি অতিরিক্ত বাঘকে আনা হয় সংরক্ষণের জন্য।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হিসেবে শিবকুমার বলেছেন যে, "পশুদের অবাধ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। তার জন্য জাতীয় উদ্যান এলাকা জুড়ে ৩৫ কিলোমিটারের তিনটি অংশে বিভক্ত একটি উন্নত রাস্তা তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।" বন্যজীবনের আবাসকে যাতে অন্তত বিঘ্নিত হয় তা নিশ্চিত করতে যানবাহনের চলাচলও থামানো হচ্ছে। পার্কের অভ্যন্তরে গাড়ির চলাচল ট্র্যাক করার জন্য সেন্সরও রয়েছে।”
