শেষ আপডেট: 16 January 2020 14:22
ইয়রেটা[/caption]
কাছে গিয়েই ভুলটা ভাঙে। দেখতে সেরকম মনে হলেও, আদৌ মখমলের মত নরম নয়। সবুজ গোলাকার ঢিপিগুলি পাথরের মত শক্ত ও নিরেট। অনেকটা ঠিক এঁচোড়ের গায়ের মতো। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে আঙুল ডোবেই না। কী এগুলো! বিস্ময়ে অবাক হয়ে যান পর্যটক থেকে অভিযাত্রীরা। এগিয়ে আসেন স্থানীয় গাইড। এবার সত্যি চোখ কপালে ওঠার পালা। এসে শুয়ে পড়েন একটি সবুজ বোল্ডারের ওপর। বোল্ডারটি এতটাই শক্ত ও এতটাই নিরেট যে এক সেন্টিমিটারও বসে যায় না।
অধৈর্য্য পর্যটকরা নানান প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন গাইডকে। উত্তর না দিয়ে গাইড একটা ভারী ছুরি দিয়ে অনেক কষ্টে বোল্ডারের একটা অংশ কেটে ফেলেন। কাটা অংশে আগুন ধরান। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে পাথরে আগুন।পর্যটকদের ধৈর্য্যের সীমা শেষ। তাঁরা উত্তেজিত হয়ে গাইডের কলার ধরার আগেই গাইড মুচকি হেসে বলেন,
-না এটা পাথর নয়, এর নীচেও কোনও পাথর নেই। আমি শুয়েছিলাম একটা গাছের ওপর যেটির বয়েস প্রায় ৩৫০০ বছর। চিরসবুজ এই গাছটির নাম ইয়রেটা। বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাজোরেলা কমপ্যাক্টা। পৃথিবীর দীর্ঘজীবী উদ্ভিদগোষ্ঠীদের মধ্যে অন্যতম হল এই ইয়রেটা।
পর্যটকেরা জানতে পারেন, চিলির অত্যন্ত শুষ্ক আটাকামা মরুভূমি, বলিভিয়া, পেরু ও পশ্চিম আর্জেন্টিনায় মূলত এদের বাস। আন্দিজ পর্বতমালার ১০৫০০ থেকে ১৪৮০০ ফুট উচ্চতায় এই উদ্ভিদদের দেখা মেলে। জনমানহীন ওই স্থানগুলিতে রৌদ্রস্নাত দিনের তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি। রোজ রাতে তাপমাত্রা শূন্যের নীচে নেমে যায়। অত্যন্ত শীতল, শুষ্ক, বৃষ্টিহীন এলাকায় এরা টিকে থাকে হাজার হাজার বছর ধরে।
অনুর্বর মাটি, বেশি পরিমাণ অ্যাসিড বা ক্ষার যুক্ত মাটি, জল দাঁড়ায় না এমন মাটিতেই জন্মায় আজব উদ্ভিদ ইয়রেটা। মাটির একেবারে কাছাকাছি জন্মায় ইয়রেটা। যেখানকার তাপমাত্রা পরিবেশের গড় তাপমাত্রার চেয়ে এক দুই ডিগ্রি থাকে মাটির ফিরিয়ে দেওয়া তাপের কারণে। ইয়রেটা বৃদ্ধি হয় খুবই মন্থরগতিতে। প্রতি বছর গড়ে মাত্র দেড় সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়। জানলে অবাক হতে হয়, Apiaceae পরিবারের এই সপুষ্পক উদ্ভিদটির আত্মীয়দের মধ্যে রয়েছে আমাদের অতি পরিচিত পার্সলে আর গাজর গাছ। যদিও চেহারা, আকৃতি ও চরিত্রে ভগ্নাংশের মিলও নেই।
-পাথরের মতো শক্ত কেন সবুজ ইয়রেটা?
অধৈর্য্য পর্যটকেরা গাইডের কাছ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর পাননি এখনও পর্যন্ত। এরকম গাছের কথা তাঁরা তো জন্মে শোনেননি। গাইড আর বিরক্তি না বাড়িয়ে বলেন," ইয়রেটার কাণ্ডের ওপরে লক্ষ লক্ষ ছোট পাতা ও কুঁড়ি একেবারে গায়ে গায়ে জমাট বেঁধে আছে। সবুজ ফুলকপি বা ব্রকোলির ওপরটা যেমন নিরেট মনে হয় এই গাছের চারদিকটা তেমনই নিরেট মনে হয়। কাণ্ড দেখা যায় না।
[caption id="attachment_178089" align="aligncenter" width="800"]
ইয়রেটার পাতা ফুল ও কুঁড়ি[/caption]
-কিন্তু কেন!
গাইড বলেন, " আসলে চরম আবহাওয়ায় টিকে থাকতে গেলে নিরেট হওয়া ছাড়া এদের উপায় ছিল না। মাটিতে জলের ভয়ংকর অভাব, যাতে শরীরের জল বাষ্প হয়ে বেরিয়ে না যায় তাই পাতাগুলি গায়ে গায়ে জুড়ে থাকে। লম্বা হলে প্রবল হাওয়া মূলশুদ্ধ গাছকে উপড়ে দেবে, তাই উচ্চতায় না বেড়ে পাশাপাশি বেড়ে হাওয়াকে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেয় বুদ্ধিমান ইয়রেটা। গোলাপি ও ল্যাভেন্ডার রঙের ছোট ছোট ফুল হয়। একই গাছের পুরুষফুল ও স্ত্রী ফুলের মধ্যে পরাগমিলন ঘটায় পতঙ্গ। ইয়রেটারা এতদিন দিব্য ছিল বুঝলেন।"
-ছিল কেন, আছে তো এখনও!
পর্যটকদের কথার উত্তরে একটু উদাস হয়ে যান গাইড, বলেন " কদিন থাকবে জানি না। সহজে জ্বালানো যায় বলে প্রাচীন কাল থেকে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করার কারণে ও বৃদ্ধির হার অত্যন্ত কম হওয়ার জন্য আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে ইয়রেটারা। গাছগুলিকে যদিও সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে, তবে আমার মনে হয় এরা আর বেশি দিন নেই।"
পর্যটকেরা জানতে পারেন, কলোরাডোর রেগিস ইউনিভার্সিটির গবেষক কেট ক্লেয়ার বহুদিন ধরে চিলিতে রিসার্চ করার পর ইয়রেটার শরীরে ভেতর ক্যানসার ও এইডস প্রতিরোধক উপাদান খুঁজে পেয়েছেন। ফলে কিছুদিন পরেই ছুটে আসবে ওষুধ কোম্পানিরা। ফলে ইয়রেটার অবলুপ্তি এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
গাড়ির দিকে হাঁটা লাগাতে লাগাতে গাইড স্তম্ভিত পর্যটকদের বলেন, "যাক, আজ একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিয়ে গেলেন আপনারা। জেনে নিলেন, দেখতে কোমল হলেও সব কিছুকে প্রকৃতি কোমল করে গড়ে না। জীবনের ময়দানে কাউকে কাউকে সবুজের আড়ালে পাথর হয়ে উঠতে হয়, স্রেফ টিকে থাকার জন্য।"