দ্য ওয়াল ব্যুরো: গরম গরম তেলে ভাজা, সঙ্গে মুড়ি। কিংবা ভাত পাতে ডালের সঙ্গে বিভিন্ন ভাজা। মাছ ভাজা থেকে রান্নার সবেতেই তেলের আধিক্য বাঙালির ঘরে পরিচিত ছবি। আলু পোস্ত, পেঁয়াজ পোস্ত, রুই পোস্তর নাম শুনলেই জিভে জল চলে আসে। ভোজন প্রিয় বাঙালির (Middle Class) হেঁসেলে চেনা রান্নার গন্ধ মাত থাকে।
কিন্তু বাঙালির ঘরে এখন উধাও হতে বসেছে সর্ষের তেল। 'ব্যবহার কমিয়েছি অনেক', কিংবা 'সর্ষের তেলের বদলে রাইস ব্রান অয়েলের ব্যবহার শুরু করেছি' টুকরো টুকরো বাঙালির হেঁসেলের গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে এমনই।
ঊর্ধমুখী বাজারের দরের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে পাল্টে যাচ্ছে বাঙালির হেঁসেলের গল্প।
জিনিসের দাম বাড়ছে দিনে দিনে, কোনও না কোনও সময় এমন চিত্রনাট্য লেখাই হয় মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবনের খাতায়। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁদের। পরিত্রাণের পথ হিসেবে খরচ কমানোকেই হাতিয়ার করেন তাঁরা। এবার সেই খরচ কমানোর গল্প ঢুকে পড়েছে মধ্যবিত্তের হেঁসেলেও।
গৃহবধূ দীপালি মণ্ডলের কথায়, "সর্ষের তেলের দাম বাড়া থেকেই ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছি। রাইস ব্রান অয়েল ব্যবহার করি। তবে এখন সেই তেলের দাম বাড়াতেও চিন্তা বাড়ছে। যত সম্ভব কম তেল ব্যবহার করি রান্নায়। ভাজাভুজি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়।"
আরও পড়ুন:
মাইক এগিয়ে দিলেন মমতা, মাঠ-ময়দানের রাজনীতিতেও হাতেখড়ি জহরের
এমনকি ব্যবহার প্রায় বন্ধ পোস্তের। হেঁসেলে দেখা নেই বাঙালির এই প্রিয় খাবারের।
বাজার ঘুরলে দামের আগুনের আঁচ লাগে মধ্যবিত্তদের। সর্ষের তেল লিটার প্রতি দাম প্রায় দুশো ছুঁইছুঁই। পোস্ত হাজার দুয়েক কিলো। এমনকি ডাল, চিনি সবেতেই দাম আকাশ ছোঁয়া। সেই দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত।
আর এক গৃহবধূ মধু দাসের কথায়, "সবেরই দাম বেড়েছে , তাই হেঁসেলেও টান দেখা দিয়েছে। ব্যবহার কমেছে। আগে যদি মাসে চার লিটার তেল ব্যবহার করতাম সেখানে এখন ২ লিটারে নেমেছে।" শুধু কি তাই সবজির বাজারেও দাম কমছে বাড়ছে।
এক ক্রেতার কথায়, "কাল যা সবজির দর গেছে, আজ এসে দেখি দাম বেড়েছে। এমন ওঠা নামা লেগেই আছে। কী করব বলুন? ভেবেছিলাম আজ কিলো খানেক বেগুন কিনে নিয়ে রাখব। এসে দামের ঠেলায় হাফ কিলো নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। দুদিন আগে যা ছিল ৫০-৬০। সেটাই এখন ৮০-৯০।
মধ্যবিত্তের হেঁসেলে কমেছে ব্যবহার, দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে মধ্যবিত্তের রান্নার পদ। এমনই চিত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে ইতিউতি। বাঁশদ্রোণির মালা রায় এখনও একার হাতে দেড় ডজন মানুষের যৌথ পরিবার সামলান। তাঁর কথায়, 'খরচ বাড়ছে, আয় বাড়ছে না, এত ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ার মত জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এসব নিয়ে ভেবে লাভ কী।' তাঁর সাফ কথা, 'খরচ বাড়ছে, খাওয়াদাওয়া বদলাও। কম তেলে রান্না কিন্তু বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির একটা অংশ। এই তো সময়, সে সব রান্না ফিরিয়ে আনার।'
দাম বাড়ার কারণ হিসেবে 'পেট্রল-ডিজেলের দাম বৃদ্ধিকেই' দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। এক ব্যবসায়ীর কথায়, "হোল সেল মার্কেটে যা জিনিস ঢুকছে সেখানেই দাম বেড়ে যাচ্ছে।" তাহলে তো সবকিছুরই দাম বাড়া উচিৎ? সর্ষের তেল বা পোস্ততেই কোপ পড়ছে কেন? সেই প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে।
তবে এক ক্রেতার কথায়, "সর্ষের চাষ যে পরিমাণ হওয়া উচিৎ সেই পরিমাণ রাজ্যে হচ্ছে না। ফলে আমদানি করতে হচ্ছে। আমদানি করার ফলেই দামে ফারাক দেখা দিচ্ছে।" সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তদের হেঁসেলের চেনা চিত্র আজ পরিবর্তনের পথে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'