দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘আমি ঈশ্বরের কাছে সব বলে দেব!’— যুদ্ধে ছাই হয়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসস্তূপে গোঙাতে গোঙাতে এই কথা বলে সুতীব্র এক অভিমানে মারা গিয়েছিল সিরিয়ার এক শিশু। ঈশ্বরের কাছে তার নালিশ করা হয়েছিল কিনা, জানা যায়নি। করা হলেও, ঈশ্বরের ঘুম তাতে নিশ্চিত ভাঙেনি।
কারণ তার কয়েক দিন পরেই সামনে এসেছিল, এক কিশোরী বোন তার কোলে দুধের শিশু ভাইকে জাপটে আকাশপানে তাকিয়ে নিঃশব্দে মারা গেছে। তখনও একমাত্র অক্সিজেন মাস্কটা ভাইয়ের মুখে ধরা, যাতে ভাইটি অন্তত বাঁচে। বাঁচেনি অবশ্য। সেও আকাশের দিকে চেয়েই নিথর হয়ে যায়। বিষাক্ত গ্যাস হামলা হয়েছিল যে সেদিন। ছোট্ট দিদি মারা যাওয়ার মুহূর্তেও অক্সিজেনের মাস্কটা নিজে না নিয়ে ছোট ভাইটির মুখে লাগিয়ে রেখেছিল, মারা যাওয়ার পরেও তার হাত সরেনি!

আচ্ছা, এমন কেউ কি আছেন, ছোট্ট সেই আয়লান কুর্দির লাল জামা পরা, উপুড় হওয়া শরীরটি যাঁকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়নি? “আমার সন্তানেরা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সন্দর শিশু, আমার সব হারিয়ে গেছে।” স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হারানোর পরে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছিলেন আয়লান কুর্দির বাবা আবদুল্লাহ কুর্দি। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে এই কুর্দি পরিবারটি আশ্রয় নিয়েছিল তুরস্কে। সেখান থেকে গ্রিস যাওয়ার চেষ্টা করার সময়ে নৌকোডুবি কেড়ে নেয় আবদুল্লার স্ত্রী ও সন্তানদের।
এক সন্তান আয়লানের বালিতে মুখ গোঁজা নিথর শরীরের ছবি মানবতার ক্ষত হয়ে থেকে যায় বিশ্ব-ইতিহাসের গ্যালারিতে।

সময় বদলে যায়, যুদ্ধের বাজি বদলে যায়। বদলে যায় ঘৃণার প্রকাশ, বদলে যায় লোভের গতিমুখ। কিন্তু আরাকান থেকে ইয়েমেন, ফিলিস্তিন থেকে সিরিয়া—শিশুমেধ যজ্ঞ চলতেই থাকে। সিরীয় শিশুরা যখন শরণার্থী নৌকায় ডুবে মারা যায়, তখনই হয়তো ইয়েমেনের শিশুরা মারা যায় খিদের জ্বালায়। যুদ্ধ থামে না, থামে না শিশুদের ট্র্যাজিক মহাকাব্য। যারা না মরে বেঁচে যায়, তাদের শৈশব সমাহিত হয় রক্তে-ট্রমায়-বিচ্ছেদে।
সারা বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের যে দুর্দশা, তার সবচেয়ে বড় শিকার নিঃসন্দেহে শিশুরা। শৈশব হারিয়ে গেছে প্রায় সকলের। যারা ফিরে পেতে চেয়ে মা-বাবার সঙ্গে ঝুঁকি নিয়েছে, তাদের অনেকে হয়তো ‘ঈশ্বরের কাছে’ ফিরে গেছে, অনেকে ডুবে গেছে অন্ধকার জগতের পাঁকে। প্রতি বছর এই শরণার্থী শিশুদের মধ্যে কত লক্ষ শিশু স্রেফ বিক্রি হয়ে যায় দাসত্ব করার জন্য, সে হিসেব বোধহয় দিনের আলোয় কোনও দিন আসে না!

এই গোটা বিষয়টিকেই বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে ‘ছোট্ট অমল’। সিরিয়ার তুর্কি সীমান্ত থেকে ইউরোপ পর্যন্ত ৮ হাজার কিলোমিটার যাত্রায় অংশগ্রহণ করবে সে। এই অমল আর কেউ নয়, একটি ছোট মেয়ের আদলে তৈরি সাড়ে তিন মিটার দৈর্ঘ্যের এক বিশাল পুতুল। তার চুলে আলুথালু জট, চোখে এক বিষণ্ণতার ছাপ। তার মুখে শৈশবের লালিত্য নেই, আছে যন্ত্রণাময় মালিন্য। আর পাঁচটা শরণার্থী মেয়ের মতোই।

গুড চ্যান্স থিয়েটার আয়োজিত ‘দ্য ওয়াক’ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে ‘লিটিল অমল’ নামের শরণার্থী পুতুলটি আগামী এপ্রিল মাসে যাত্রা শুরু করবে এবং গ্রিস, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স হয়ে জুলাই মাসে ইউরোপ পৌঁছবে বলে আশা করা হচ্ছে। তার ঠিক আগে ২০২১ সালের জুলাই মাসে ম্যাঞ্চেস্টার ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যালে পৌঁছবে সে।

দ্য ওয়াকের প্রযোজক ট্রেসি সিওয়ার্ড বলেন, “লিটল অমলের যাত্রা একটি অনন্য শিল্প প্রকল্প। আমাদের আশা, শরণার্থীদের সন্তানদের যে গভীর কষ্ট, তার কিছুটা নিরাময়ে সাহায্য করবে এই উদ্যোগ। অমল তাদের গল্প বলবে, যাদের গল্প সারা বিশ্বের জানা উচিত, মনে করা উচিত। সে সব শরণার্থী সম্প্রদায়কে একত্রিত করবে এবং এই অপরিসীম যন্ত্রণার মূল্যায়ন করবে। শুধু তাই নয়, এ যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে যে তাদের আরও প্রাপ্তি ছিল এ পৃথিবীর কাছে, তা নিশ্চিত করে সকলকে জানিয়ে দেবে অমল।”

ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ইউরোপে আগত মোট গোপন অভিবাসী এবং আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৯২০ জন। এ বছর এখনও পর্যন্ত ইরাকের দুহক প্রদেশের বারদারাস শিবিরে সিরিয়া থেকে কমপক্ষে ৮,৮৫০ জন নতুন শরণার্থী এসে পৌঁছেছেন।
এ সমস্যার শেষ কোথাও কেউ জানে না। কিন্তু এ যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে শিশুরা ভাল নেই, ‘অমল’ সে কথা জানে। সে কথাই সে পৌঁছে দেবে বিশ্বজুড়ে।