দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্বাধীনতা দিবসে অর্থাৎ ১৫ অগস্টে আসতে পারে ভারতের তৈরি করোনাভাইরাসের টীকা, 'কোভ্যাক্সিন।' ৭ জুলাই থেকে শুরু হতে চলেছে হিউম্যান ট্রায়াল, সব ঠিক থাকলে ইতিহাস গড়বে ভারত। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর এই ঘোষণা সামনে আসার পর থেকেই একদিকে যেমন প্রশংসার বন্যা বয়ে গেছে, করোনার সঙ্গে লড়াইয়ের সাধারণ মানুষের মনোবল জোরদার হয়েছে, তেমনই প্রশ্ন উঠছে এই ভ্যাকসিনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও। প্রশ্ন উঠেছে, এত দ্রুত কীভাবে ভ্যাকসিনটি তৈরি হল! কীভাবেই বা পরীক্ষাপর্ব শেষ হওয়ার আগেই তারিখ ঘোষণা হল এটি বাজারে আসার।
এই সমস্ত প্রশ্ন ও সমালোচনার জবাব দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল আইসিএমআর। শনিবার আইসিএমআর-এর ডিরেক্টর জেনারেল জানান, ভারতে এই ভ্যাকসিনটি তৈরি ক্ষেত্রে সমস্ত পদক্ষেপই সঠিকভাবে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোনও কারণে যাতে এই ভ্যাকসিন তৈরির পদ্ধতিতে দেরি না হয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। তার পরেও আইসিএমআর-এর পেশাদারিত্বকে যে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে, সেটা খুবই বিস্ময়জনক বলে জানান তিনি।
আইসিএমআর কর্তৃপক্ষের মতে, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে এখন সর্বোচ্চ চেষ্টা ও গতিতে ভ্যাকসিন তৈরির গবেষণা করছে। একই পথে হাঁটছে ভারতও। তবে ভ্যাকসিন তৈরি এবং ট্রায়ালের ক্ষেত্রে যাতে কোনও রকম ভাবে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাদ না যায়, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই ভ্যাকসিনটি ব্যতিক্রম নয় বলেই দাবি করেছে আইসিএমআর। অনেকেরই অভিযোগ, আইসিএমআর একথা জানালেও ঠিক যে প্রশ্নগুলো উঠেছে এই ভ্যাকসিনের প্রকাশ নিয়ে, তা নিয়ে সদর্থক জবাব মিলছে না।
প্রসঙ্গত, শুক্রবারই আইসিএমআর-এর ডিরেক্টর জেনারেল বলরাম ভার্গব জানান, মানবদেহ করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন কোভ্যাক্সিনের নানা পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে এখনও। আইসিএমআর এবং ভারত বায়োটেক যৌথভাবে এই করোনা ভ্যাকসিন বাজায় আনতে চলেছে, যার একটি দিন আপাতত ঠিক করা হয়েছে ১৫ অগস্ট। যদি মানবদেহে এই ভ্যাকসিন ট্রায়াল ইতিবাচক ফলাফল দেয় সেক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিবসের দিনে সাধারণ মানুষের দেহে প্রয়োগ করা হবে ভ্যাকসিন।
এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরে আজ, শনিবার আইসিএমআর-এর ডিরেক্টর কেবল স্পষ্ট করে দেন, ভ্যাকসিনটি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য হলেই তবে তা বাজারে আনা হবে।
আইসিএমআর জানিয়েছে, কোভ্যাক্সিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলি শেষ হয়েছে। সফলও হয়েছে। হিউম্যান ট্রায়ালও হয়ে যাবে খুব শিগ্গিরি। শেষ পর্যায়ে সাফল্য পেলে ১৫ অগস্টের মধ্যে কোভিড ভ্যাকসিন এসে যাবে। আইসিএমআর ইতিমধ্যেই তার সমস্ত স্টকহোল্ডারকে চিঠি দিয়েছে, এই ট্রায়ালটিকে যেন শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বৃহস্পতিবার আইসিএমআর নিজেই দেশের প্রথম কোভিড -১৯ ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য ১২টি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়েছে।
বিশাখাপত্তনম, রোহতক, নয়াদিল্লি, বেলগাম, পাটনা, নাগপুর, গোরখপুর, কাট্টানকুলাথুর, হায়দরাবাদ, আর্যনগর, কানপুর ও গোয়ার এই বেছে নেওয়া কেন্দ্রগুলিতে ৭ জুলাই থেকেই শুরু হয়ে যাবে মানব শরীরে এই ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক ব্যবহার। গোটা জুলাই মাস ধরেই চলবে ট্রায়াল। ১২টি কেন্দ্রে ১,১২৫ জনের ওপর এই পরীক্ষা হবে বলে ঠিক হয়েছে। এর পরেই নির্ধারিত হবে ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত ভাগ্য। পাশ করে গেলে, স্বাধীনতা দিবসেই ইতিহাস গড়বে ভারত।
অথচ সরকারের যে নিজস্ব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এজেন্সি, তা বলছে, এই হিউম্যান ট্রায়ালের সময়সীমা অন্তত ১ বছর ৩ মাস। যে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ৭টি স্বশাসিত সংস্থা এখনও কাজ শুরু করার সবুজ সংকেতই পায়নি। পাওয়ার পরে, যাঁদের ওপর পরীক্ষা হবে ৭ তারিখের মধ্যে তাঁদের নামের তালিকা তৈরি করা অসম্ভব বলে তারা জানিয়েছে।
ভারত বায়োটেক, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি (এনআইভি)-র যৌথ উদ্যোগে করোনাভাইরাসের এই প্রতিষেধকটি তৈরি করা হয়েছে। কোভ্যাক্সিনের সমস্ত বিস্তারিত বিবরণ ভাল করে খুঁটিয়ে দেখে, হিউম্যান ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনেরাল অব ইন্ডিয়া।
জানা গেছে, পুনের এনআইভি-তে সার্স কভ ২ অর্থাৎ নোভেল করোনাভাইরাসের বিশেষ স্ট্রেনকে আলাদা করা হয়েছে রোগীদের নমুনা থেকে এবং তা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ভারত বায়োটেকে। এর পরেই সর্বাধিক জৈব নিরাপত্তায় এই দেশজ টীকা তৈরির কাজ শুরু হয় হায়দরাবাদের জেনোম ভ্যালিতে। ভারত বায়োটেকের হাইকনটেনমেন্ট ব্যবস্থার মধ্যেই পুরো কাজ হয়। পশুর উপর প্রয়োগ করে পরীক্ষা করার পর্বও মিটে গিয়েছে।
কিন্তু বাকিটা এত দ্রুত মিটবে কি, আর তা না মিটলে তারিখ ঘোষণা করা যায় কি? এই প্রশ্নই তুলছেন সকলে।