
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 14 September 2024 15:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শনিবার দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎ যেভাবে ধর্নামঞ্চে পৌঁছে গেলেন তাতে শুধু জুনিয়র ডাক্তাররা নয়, গোটা বাংলাই প্রায় হতচকিত। রাজনীতিতে গোদা বাংলায় একে বলে ‘পালের হাওয়া কেড়ে নেওয়া’!
এমনিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বরাবরই একটা জাঢ্য কাজ করে। যে জাঢ্য অনেক সময়েই শাসককে নরম হতে বাধা দেয়। বাইরে থেকে যা দেখে মনে হয় শাসকের ইগো বা রাজনীতি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যখন সেই ইগোর পাঁচিল ভেঙে বৃষ্টি ভেজা দুপুরে ধর্না মঞ্চে চলে যান, এবং সেখানে গিয়ে অনুরোধের স্বরে বলেন, দয়া করে আমার কথাটা একবার শুনুন। আমি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসিনি, আমি আপনাদের বড় দিদি হিসাবে এসেছি। আপনাদের আন্দোলনকে আমি কুর্নিশ জানাই। আপনাদের সব অভাব অভিযোগের কথা শুনে আমি যথাসম্ভব কঠোর ব্যবস্থা নেব, কেউ দুর্নীতি করে থাকলে শাস্তি দেব— এর পর আর বলার কিছু থাকে কি?
জুনিয়র ডাক্তারদের ৬ দফা দাবি দাওয়া খুবই স্পষ্ট। নবান্ন সভাঘরে গিয়ে তাঁরা সে কথা মুখ্যমন্ত্রীকে জানাবেন, তেমনই কথা হয়েছিল। শুধু লাইভ স্ট্রিমিংয়ের ব্যাপারে জেদাজেদিতে তা গত বৃহস্পতিবার ভেস্তে যায়। সরকার সেই দাবি মানেনি। কিন্তু শনিবার দুপুরে যে ঘটনাটা স্বাস্থ্য ভবনের সামনে ঘটল, তা লাইভ স্ট্রিমিং ছাড়া আবার কী!
গোটা রাজ্য দেখল যে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, এই রাজ্য উত্তরপ্রদেশ নয়। আমি গায়ের জোরে আপনাদের তুলব না। ঝড়জলের মধ্যে বসে আছেন, যে যা খাবার দিচ্ছে তা খাচ্ছেন, আমার দেখে কষ্ট হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে মঙ্গলবার শুনানি রয়েছে। আমি চাই না আপনাদের কোনও ক্ষতি হয়ে যাক।
গোটা রাজ্য মুখ্যমন্ত্রীকে এও বলতে দেখল, আপনারা ভাবছেন, কেউ বোধ হয় আমার বন্ধু! কিন্তু আমি তাঁদের চিনি না, তাঁদের আমি জানি না। তাঁদের সুপারিশ আমার কাছে আসে একটা প্রসেসের মধ্যে দিয়ে। যদি তাঁদের মধ্যে কেউ কোনওভাবে জড়িত থাকেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব। আপনারা আমাদেরই ঘরের ভাইবোন। আমি এটুকু বলতে পারি, আপনাদের সঙ্গে কোনও অবিচার হবে না। কাউকে দোষী পেলে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেব”
পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, এ হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাস্টারস্ট্রোক। এবং এ ঘটনার পর জুনিয়র ডাক্তারদের উপর আলোচনার টেবিলে বসার ও কাজের ফেরার ব্যাপারে প্রবল চাপ তৈরি হল।
প্রশ্ন উঠতে পারে কেন? কারণ, সুপ্রিম কোর্ট তো বটেই গোটা রাজ্যকে মুখ্যমন্ত্রী শনিবার পরিষ্কার করে বার্তা দিলেন, কাউকে আড়াল করার উদ্দেশ্য তাঁর নেই। তিনিও বিচার চান। সেই সঙ্গে ডাক্তারদের সমস্তরকম নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাঁর সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, জুনিয়র ডাক্তারদের ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে কাজে ফিরতে হবে। সেই নির্দেশ জুনিয়র ডাক্তাররা মানেনি। এর পর যদি মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে এই প্রশ্নও করে যে জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য কেন কোনও ব্যবস্থা নিল না, তাতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাভ বই ক্ষতি নেই। আবার সুপ্রিম কোর্ট যদি জুনিয়র ডাক্তারদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দেয় তাও সরকারের বিরুদ্ধে যাবে না। ফলে এর পর জুনিয়র ডাক্তারদের আলোচনার টেবিলে ফেরত যাওয়া ছাড়া উপায়ন্তর কম বলেই অনেকে মনে করছেন।
ডাক্তারদের আলোচনায় যাওয়া উচিত বলে এমনিতেই অনেকে বলতে শুরু করেছেন। আরজি কর কাণ্ডে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানানোয় অন্যতম মুখ ছিলেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। শুক্রবার সৃজিতও বলেন, বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা রাখা উচিত। আলোচনায় যখন ডাকা হচ্ছে, সেটাকেও ইতিবাচক বলে মনে করা উচিত। তা নিয়ে খুব হতাশাবাদী বা সন্দেহপ্রবণ হওয়া ঠিক হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, মুখ্যমন্ত্রী কৌশলে জুনিয়র ডাক্তারদেরও একটা এক্সিট রুট দিলেন। কারণ, আন্দোলন শেষ করতে তাঁদেরও হাতে কিছু আসা দরকার ছিল। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যখন ধর্নাস্থলে পৌঁছে সমস্তরকম আশ্বাস দিয়েছেন, তার পর তাঁরা দাবি করতে পারেন যে তাঁদের আন্দোলন সফল। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানির আগে তাঁদের কাজে ফেরার একটা সুযোগ তৈরি হল এবং মুখরক্ষা হল।
সবমিলিয়ে যে ভাবে সরকারের বিরুদ্ধে যে একটা নেতি নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কেটে গেল তা হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু শনিবার অন্তত অনেকটাই উচ্চস্থানে পৌঁছে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর সরকার।