দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ধাক্কা খেয়েছে। ভারতীয় অর্থনীতিও ব্যতিক্রম নয়। বিশ্ব ব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার এবং রেটিং সংস্থাগুলি অনুমান করছে ভারতের অর্থনীতির অভূতপূর্ব সংকোচন হতে চলেছে।
পরিস্থিতি যখন এমনই তখন বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ বলেছেন, তিন ওষুধে সারতে পারে ঘরোয়া অর্থনীতির ব্যামো। সরকারকে ‘অবিলম্বে’ তিনটি পদক্ষেপ করতে হবে।
এক- মানুষের জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে সরাসরি নগদে হস্তান্তর তথা ক্যাশ ট্রান্সফার করতে হবে। তার ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে এবং বাজারে চাহিদা তৈরি হবে।
দুই- ব্যবসার মূলধনের জন্য যোগান বাড়াতে হবে। আর তা করতে হবে সরকার পোষিত ক্রেডিট গ্যারান্টি প্রোগ্রামের মাধ্যমে। অর্থাৎ ব্যবসায় মূলধনের যোগান বাড়াতে সরকারকেই সুনিশ্চিত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়- অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে। অর্থাৎ তারা নিজেদের বিবেচনা মতো পদক্ষেপ করবে। সরকার নাক গলালে চলবে না।
করোনাভাইরাসের প্রকোপের আগে থেকেই দিগন্তে অর্থনৈতিক মন্দা গ্রাসের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করতে পারছিলেন যে বৃদ্ধির দর কমবে। হয়েছেও তাই। ২০১৯-২০ আর্থিক বছরে বৃদ্ধির দর কমে ৪.২ শতাংশ হয়েছে। গত এক দশকে এত কম হারে বাড়েনি ভারতীয় অর্থনীতি। সেই সংকটের মধ্যেই আবার করোনা এসে পড়েছে। উপর্যুপরি লকডাউনের কারণে চলতি আর্থিক বছরের শুরু থেকেই উৎপাদন ক্ষেত্র ধাক্কা খেয়েছে। বাজারে চাহিদাও নেই। যে ভাবে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে তাতে অনিশ্চয়তার মেঘ ক্রমশই গাঢ় হচ্ছে।
ভারতে অর্থনৈতিক উদারিকরণ ও সংস্কারের জনক বলা হয় নরসিংহ রাও জমানার অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে (যদিও মনমোহন বলেন, এ ব্যাপারে জনক ছিলেন নরসিংহ রাওই)। বিবিসিকে দেওয়া ই-মেল সাক্ষাতকারে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “আমি মন্দা শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। ওটা শুনতে রুক্ষ লাগে। বরং আমি বলব, অর্থনৈতিক মন্দগতি অনিবার্য এবং তা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।”
করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর সরকার যে হাত গুটিয়ে বসে ছিল তা নয়। মার্চ মাসের চতুর্থ সপ্তাহে গরিবদের জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। রেশনে চাল, ডাল দেওয়ার পাশাপাশি জনধন অ্যাকাউন্টে পাঁচশ টাকা করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে উজ্জ্বলা যোজনায় প্রতি পরিবারকে বিনামূল্যে তিন মাস রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার দিয়েছে সরকার। ব্যবসায় ঋণ তথা মূলধনের যোগান বাড়াতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকেও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ঋণগ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। তা ছাড়া কদিন আগে ৮ কোটি কৃষকের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ১৭ হাজার কোটি টাকা ট্রান্সফার করেছে সরকার।
তবে মনমোহনের বক্তব্য, সরকার অবিবেচকের মতো কাজ করেছে। হয়তো ওই পরিস্থিতিতে লকডাউন করে দেওয়া অপরিহার্য ছিল। কিন্তু যে আকষ্মিকতার সঙ্গে সরকার তা করেছে তাতে অসহায় হয়ে পড়েছে বহু মানুষ। শ্রমিক, মজুর ও গরিবদের দুর্ভোগ বেড়েছে। অর্থনীতির মন্দ গতির নেপথ্যে এই মানবিক বিষয়গুলি রয়েছে। শুধু অর্থনীতির অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে চলবে না।
সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, গণ স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয় সরকার তা সবথেকে ভাল মোকাবিলা করতে পারে। কেন্দ্রের উচিত ছিল নিয়ম নীতি, রূপরেখা বাতলে দিয়ে তাদের উপরেই মূল দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া।
বিশ বছর আগে মনমোহন যখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখনও দেশ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছিল। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় কমে গিয়ে অর্থনীতির তখন প্রায় দেউলিয়া অবস্থা। মনমোহন অবশ্য সাক্ষাতকারে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সেদিনের থেকেও খারাপ। “চলতি অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা ও মাত্রা নজিরবিহীন। সংক্রমণের কারণে যে ভাবে গোটা দুনিয়া থমকে গিয়েছে তা অতীতে কখনও হয়নি। এমনকি বিশ্ব যুদ্ধের সময়েও না।
টাকা ছাপানো শেষ বিকল্প হতে পারে
চলতি সংকটের পরিস্থিতিতে অনেক দেশই টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে হেতু এখন রাজস্ব আদায় তলানিতে, তাই বিপাকে প্রায় সব সরকারই। এই অবস্থায় সরকার যাতে প্রয়োজন মতো খরচ করতে পারে সে জন্যই টাকা ছাপানোর পথে হাঁটছে অনেক দেশ। সেই পথ নিয়ে আবার কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, বাজারে টাকার যোগান বেড়ে গেলে তাতে মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতি তৈরি হবে।
সাক্ষাতকারে মনমোহন বলেছেন, “অর্থনৈতিক ঘাটতি মেটাতে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে ভারত অনেক আগেই সরে এসেছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা কায়েম করা হয়েছে। সরকারের থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে আলাদা করা হয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে।” তাঁর কথায়, অতিরিক্ত টাকার যোগান উন্নত দেশগুলিতে আর মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতি তৈরি করে না। কিন্তু ভারতের মতে দেশে লাগামহীন ভাবে টাকা ছাপানো শুরু হলে তার প্রভাব মুদ্রা ও বাণিজ্যের উপর পড়বে। আমদানি খরচ বেড়ে যাবে। সুতরাং বাকি আর কোনও পথ না থাকলে সেটা শেষ বিকল্প হতে পারে।