মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ফোনের ক্যামেরায় টেপ।

ছবি: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 28 January 2026 23:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পেগাসাস (Pegasus) বিতর্কের কথা মনে আছে? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রশান্ত কিশোরের ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ ওঠার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) স্লোগান তুলেছিলেন, ‘পেগাসাস ডেঞ্জারাস ফেরোসাস।’ তার পর তাঁর আই ফোনের ক্যামেরার উপর টেপ সেঁটে দিয়েছিলেন। অবিকল তেমনই মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় টেপ লাগাতে দেখা গেল, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে(Benjamin Netanyahu phone camera tape)। তার পরই সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে কৌতূহল আর প্রশ্নের ঝড়। কারণ একটাই— যে দেশ বিশ্বজুড়ে সাইবার গোয়েন্দাগিরি ও সাইবার নিরাপত্তার জন্য পরিচিত, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে কেন ফোনের ক্যামেরা ঢেকে রাখছেন?
জানিয়ে রাখা ভাল মমতা যে পেগাসাস (Pegasus spyware) আতঙ্কে ফোনে টেপ লাগিয়েছিলেন, সেই স্পাইওয়ার বানিয়েছিল ইজরায়েলেরই সাইবার-আর্ম সংস্থা এনএসও গ্রুপ (NSO Group)। অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে—যদি এমন এক দেশের সরকারপ্রধান, যাঁর চারপাশে সর্বক্ষণ কড়া নিরাপত্তা বলয়, গোয়েন্দা সংস্থা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে, তিনিও যদি নিজের ফোনের ক্যামেরা ঢেকে রাখতে বাধ্য হন, তাহলে সাধারণ মানুষের স্মার্টফোন আদৌ কতটা নিরাপদ?
তবু বাস্তব হল, নেতানিয়াহুর মোবাইল ফোনের ছবির পর অনেকেই বলতে শুরু করেছেন—“যদি রাষ্ট্রনায়করাই নিজেদের ফোনে ভরসা না রাখেন, তাহলে আমরা কেন রাখব?” সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ব্যবহারকারীর মন্তব্য, “রাষ্ট্র চালানো মানুষজনই যদি ফোনের ক্যামেরা ঢেকে রাখেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা কোথায়?”
ক্যামেরা হ্যাক হওয়া কি সত্যিই সম্ভব? (can your phone camera be hacked)
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর—হ্যাঁ। এই ধরনের হ্যাকিং প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্যামফেক্টিং (Camfecting)।
ক্যামফেক্টিং কী? ক্যামফেক্টিং হল এমন এক সাইবার আক্রমণ, যেখানে হ্যাকার দূর থেকেই কারও মোবাইল বা ল্যাপটপের ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—ব্যবহারকারী জানতেও পারেন না। গোপনে ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ড করা বা নজরদারি চালানোই এর মূল উদ্দেশ্য। অনেক সময়ে ব্ল্যাকমেল বা গুপ্তচরবৃত্তির জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়।
এই আক্রমণ সাধারণত হয়—
ক্ষতিকর অ্যাপ বা সফটওয়্যার ডাউনলোডের মাধ্যমে
সন্দেহজনক ইমেল বা লিঙ্কে ক্লিক করলে
পুরনো অপারেটিং সিস্টেমে থাকা নিরাপত্তা ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে
একবার ফোনে এই ম্যালওয়্যার ঢুকে পড়লে, ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন নিঃশব্দে চালু হয়ে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক হ্যাকিং বিতর্ক ও ইজরায়েলের উদ্বেগ
জানুয়ারির শুরুতেই ইরান-ঘনিষ্ঠ হ্যাকার গোষ্ঠী ‘হান্দালা’ দাবি করে, তারা ইজরায়েলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ফোনে ঢুকতে পেরেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চিফ অফ স্টাফের ফোন হ্যাক হওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। আরব সংবাদমাধ্যমেও এই বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই অনেকের ধারণা—নেতানিয়াহুর ফোনের ক্যামেরায় টেপ লাগানো নিছক অভ্যাস নয়, বরং চূড়ান্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখবেন? (phone camera hacked signs)
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যামফেক্টিং থেকে বাঁচতে কয়েকটি সহজ অভ্যাসই অনেকটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে—
১) ফোনের ক্যামেরা ঢেকে রাখা: সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায়।
২) নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করা, পুরনো সিস্টেম মানেই ঝুঁকি বেশি।
৩) অ্যাপের অনুমতি খতিয়ে দেখা, অপ্রয়োজনীয় ক্যামেরা অ্যাক্সেস বন্ধ করুন।
৪) অচেনা লিঙ্ক ও অ্যাপ এড়িয়ে চলা, অফিসিয়াল অ্যাপ স্টোর ছাড়া কোথাও থেকে কিছু ডাউনলোড করবেন না।
৫) পাবলিক ওয়াই-ফাইয়ে সাবধানতা, প্রয়োজনে ভিপিএন ব্যবহার করুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘ডিজিটাল হাইজিন’ মেনে চললেই অধিকাংশ সাধারণ ব্যবহারকারী নিরাপদ থাকতে পারেন।
তাহলে কি নেতানিয়াহু সত্যিই ভয় পাচ্ছেন?
সরকারিভাবে এ বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে শুধু ইজরায়েলের সাইবার ডাইরেক্টরেট ২৬ হাজারেরও বেশি গুরুতর সাইবার আক্রমণ সামলেছে—যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোনের ক্যামেরায় টেপ লাগানো কোনও আতঙ্ক নয়—বরং ‘ফাইনাল সেফটি লেয়ার’। যখন সব প্রযুক্তি ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন এই ছোট্ট টেপই শেষ ভরসা।