দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'আপনি আচরি ধর্ম, পরেরই শিখাও...', বাংলায় এমন প্রবাদ প্রচলিত আছে, নিজে আগে ধর্ম পালন করো, পরে অন্যকে শেখাবে। করোনা মোকাবিলায় ফের একবার সেই দৃষ্টান্তই স্থাপন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বারবার সেই কথা যেমন সবাইকে মনে করিয়ে দেন, তেমন পালনও করেন তিনি নিজেও। স্ত্রী করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর ভাই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন কথাও নবান্নের সাংবাদিক সম্মেলনে বলে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। স্বভাবই তিনি যে করোনা সতর্কতা নিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবেন তা বলাই বাহুল্য। সোমবার তেমন আরেকটি নজির সৃষ্টি করলেন তিনি। সোমবার চূড়ান্ত সতর্কতা নিয়েই প্রয়াত শাঁওলি মিত্রকে রবীন্দ্র সদনে শেষ সম্মান জানাতে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী এদিন যে রবীন্দ্র সদন যাবেন সে কথাও কাউকেই জানতে দেননি।
প্রসঙ্গত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবসময়ই করোনা সংক্রমণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এখন নয়, গোড়া থেকেই। শুধু একা নিজে নন, অন্যকেও সতর্ক করেন সর্বদা। এমনকি পরামর্শও দেন কী করা উচিৎ আর কী করা উচিৎ নয়! এমন বহু দৃষ্টান্ত রেখেছেন তিনি। রাজ্যের সংক্রমক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রীর মত নেতা মন্ত্রীদের তরফে এই ধরনের মহামারী মোকাবিলায় সচেতনতার এমন বার্তা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অনেক প্রথম সারির নেতা মন্ত্রী সেটা খেয়াল রাখছেন না। এর আগে দেখা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির মুখে মাস্ক নেই। কিন্তু নেতাদের সতর্ক আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে বিধিকে অনেক জরুরি এবং সঠিক দিশা বলে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
দিন দশেক আগের কথাই। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেদিন তিনি হাতে গ্লাভস পরেছিলেন। দিন কয়েক আগে মুখ্যমন্ত্রীর শেষ সাংবাদিক বৈঠকেও দেখা গিয়েছে একই চিত্র। যা আগে দেখা যায়নি। এমনকি টিস্যুতে মুড়ে মাইক্রোফোন হাতে নেওয়ার ছবিও দেখা গেছে। সে নির্বাচনী প্রচার হোক, বা প্রশাসনিক বৈঠক। সতর্ক সবসময়।
অনেকের মতে, করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে মমতা অনেকটা সতর্ক সংক্রমণ নিয়ে। তাই তিনি একটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করছেন। যেমন, নবান্নে তিনি সেদিন বলেছিলেন, 'আমার একাধিক অফিসার আক্রান্ত হয়েছেন। দুই গাড়ির চালকও কোভিড আক্রান্ত। আমার সঙ্গে মুখ্যসচিবের ফোনে দিনে একাধিক বার কথা হয়, তাই নবান্নে এসে অফিসারদের সংক্রমণ বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি পরের দিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক কালীঘাটের বাড়ি থেকেই যোগ দেব।'
সেদিনই বোঝা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী কদিন বাড়ি থেকেই কাজ করবেন। নবান্ন আসবেন না। সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত মমতা আর নবান্ন যাননি।
শুধু তাই নয়, প্রতিটি সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বারবার করোনা নিয়ে সতর্ক করেছেন। দূরত্ব, মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহারের ওপর জোর দিতে বলেছেন প্রায় প্রতিটি সাংবাদিক সম্মেলন থেকেই। নিজের ও পরিবারের মানুষের ওপর নজর রাখতে বলেছেন।
করোনা যখন প্রথম হানা দেয় তখন থেকেই তিনি সদা সতর্ক। মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে জোর দিতে বলেছেন সবসময়। এমনকি তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল যে, সঙ্গে মাস্ক না থাকলে ছেলেরা রুমালই মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করুন আর মহিলারা শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন। যা নিয়ে অনেকেই মজা করেছিলেন সেই সময়। কিন্তু আদতে দেখতে গেলে এটাও এক সতর্কতার নজির। একটাই বার্তা, নাক-মুখ ঢাকুন, স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন, অযথা বাড়ির বাইরে বেরোবেন না।
উদাহরণ হিসেবে আরও বলা যায়, লকডাউনের পর যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে জনজীবন, আস্তে আস্তে খুলছে বাজার দোকান, তখন মমতাকে দেখা গেছে চক হাতে নিজেই রাস্তায় নেমে পড়েছেন। দাগ কেটে দূরত্ব বিধি বুঝিয়েছেন সবাইকে। এছাড়াও সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন, 'লেবু, ডিম খান বেশি করে।' তাঁর এই উপদেশ বা পরামর্শ শুনে কখনও মনে হয়নি যে তিনি মুখ্যমন্ত্রী, মনে হয়েছে পরিবারের একজন!
শুধু তাই নয়, করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে নিজের ভাইকেও ভর্ৎসনা করতে ছাড়েননি মমতা। স্ত্রী করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর ভাই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন কথাও নবান্নের সাংবাদিক সম্মেলনে বলে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। আর আজ যা হল। তার পরিপ্রেক্ষিত বিচার করলে বোঝা যায় কতটা সতর্ক মমতা।
কেন? শাঁওলি মিত্র মারা গিয়েছেন গতকাল দুপুরেই। শেষকৃত্যও হয়ে গিয়েছে গতকালই। তবে রবীন্দ্র সদনে রাজ্য সরকারের তরফে শাঁওলি মিত্রের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল সোমবার। সেখানে সকালে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ফুলের মালা আছে।
অনেকে ভেবেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী সদনে হয়তো আর আসবেন না। কিন্তু দেখা যায় বিকেলে মুখ্যমন্ত্রী সদনে এলেন। দেখা যায় তাঁকে দূর থেকে প্রণাম করতে। কিন্তু ছবিতে কোনও ফুল বা মালা দিতে দেখা যায়নি তাঁকে। এদেখেই অনেকের ধারণা, মুখ্যমন্ত্রী কোভিডের মধ্যে বেশি ছোঁয়াছুঁয়ি করতে চাইছেন না। এমনকি তাঁর আসার কথাও জানা ছিল না অনেকের। আর তা ভিড় এড়াতেই বলে মত অনেকের।