মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার বলেন, "আমি হতবাক ও অত্যন্ত বিচলিত হয়েছি। এটি গণতন্ত্রের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ। অসমের বিজেপি সরকার কোনও সাংবিধানিক ক্ষমতা ছাড়াই বাংলায় এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।"

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 9 July 2025 00:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের দিনহাটায় বসবাস করছেন রাজবংশী সম্প্রদায়ের উত্তম কুমার ব্রজবাসী। তাঁর কাছে বৈধ পরিচয়পত্রও রয়েছে। তবু তাঁকে 'বিদেশি' কিংবা 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' সন্দেহে এনআরসি (NRC) নোটিশ পাঠিয়েছে অসমের ফরেনার্স ট্রাইবুনাল (Assam Foreigners Tribunal)। এই ঘটনাকে নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।
মুখ্যমন্ত্রী মঙ্গলবার বলেন, "আমি হতবাক ও অত্যন্ত বিচলিত হয়েছি। এটি গণতন্ত্রের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ। অসমের বিজেপি সরকার কোনও সাংবিধানিক ক্ষমতা ছাড়াই বাংলায় এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এটি একটি "পূর্বপরিকল্পিত ও বিপজ্জনক চক্রান্ত" যার লক্ষ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এবং বাংলার মানুষের পরিচয় মুছে ফেলা। বিজেপির এই পদক্ষেপকে "গণতান্ত্রিক সুরক্ষার ওপর হামলা" বলেই মনে করছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।
এই পরিস্থিতিতে সমস্ত বিরোধী দলগুলিকে একজোট হয়ে বিজেপির "বিভাজনমূলক ও দমনমূলক রাজনীতি" বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর হুঁশিয়ারি, "বাংলা চুপ করে থাকবে না।"
এনআরসি কী?
এনআরসি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) হল একটি সরকারি তালিকা যেখানে ভারতের নাগরিকদের নাম নথিভুক্ত করা হয়। ২০১৯ সালে অসমে এনআরসি-র একটি তালিকা প্রকাশিত হয় যেখানে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ে। মূলত, যাঁদের কাছে ১৯৭১ সালের আগের প্রমাণ সহ বৈধ নাগরিকত্বের দলিল নেই, তাঁদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিরোধীদের আশঙ্কা, এই ধরনের তালিকা জাতি, ধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে বৈষম্যের পথে নিয়ে যেতে পারে দেশকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এনআরসি-র বিরুদ্ধে বরাবরই প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন মানবিক সঙ্কট তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে তেমনভাবে সাধারণ মানুষের পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
এই ঘটনার পেছনে বিজেপির "রাজনৈতিক উদ্দেশ্য" রয়েছে বলেই অভিযোগ করেছেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর মতে, এই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলার সাংবিধানিক অধিকার ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, এনআরসি-কে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির নেপথ্যে বিবদমান রাজনৈতিক দর্শন রয়েছে। ২০২৬ সালের গোড়ায় অসম ও পশ্চিমবঙ্গ দুই রাজ্যেই বিধানসভা ভোট রয়েছে। অসমে হিমন্ত বিশ্বশর্মা সরকার এনআরসি-র জিগিড় তুলে ভোটের আগে মেরুকরণ তীব্র করতে চাইছেন। আর বাংলার শাসক দলের উদ্বেগ হল, এনআরসি বা ভোটার তালিকা সংশোধনের নাম করে বাংলার বহু মানুষকে তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা হতে পারে। ছাব্বিশের ভোটের আগে হঠাৎ এই তৎপরতায় বিজেপির ষড়যন্ত্র বা কৌশলই দেখছে তৃণমূল।
এবার এই বিষয়ে সরব হলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, "এটি আসলে বাংলায় এনআরসি চালু করার এক ষড়যন্ত্র। এবং তা করা হচ্ছে পেছনের দরজা দিয়ে, একেবারে প্রতারণার পথে।"
এই প্রসঙ্গে বিজেপিকে কটাক্ষ করে অভিষেক লেখেন, "যেখানে জনমতের কোনও সমর্থন নেই, নৈতিক অধিকার নেই, সেখানে বিজেপি বাংলাভাষী নাগরিকদের ভয় দেখিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ঠেলে দিতে চাইছে। অসমে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করে যেভাবে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, বাংলায় ঠিক তেমনটাই করা হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, “বাংলার মানুষ এখনও বিজেপিকে ক্ষমতায় আনেনি, তার আগেই যদি এই ধরনের ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।”
This is nothing but an insidious attempt to introduce NRC through the backdoor in Bengal, a state where BJP has neither the mandate nor the moral right to govern. They are targeting Bengali-speaking citizens to create fear and insecurity, and attempting to replicate Assam's… https://t.co/f0MBb75vIQ
— Abhishek Banerjee (@abhishekaitc) July 8, 2025
তৃণমূল সাংসদের স্পষ্ট বার্তা, “এটা এখন আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। এটি এক দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই—যে লড়াই গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ এবং সংবিধান নির্ধারিত অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির পক্ষে। বাংলার মাটিতে বিজেপির বিভাজনের রাজনীতি, জনবিরোধী নীতি এবং একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।”