
প্রাক্তন মুখ্য সচিব তথা মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্য পুলিশের এডিজি দক্ষিণবঙ্গ সুপ্রতিম সরকার এবং কলকাতা পুলিশের ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 27 August 2024 21:42
শঙ্খদীপ দাস
বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানায় কেজো মন্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। এহেন সুব্রতবাবু ঘরোয়া আলোচনায় প্রায়ই একটা কথা আক্ষেপের সঙ্গে বলতেন। তা হল, অবাঙালি আমলাদের অনেকেরই বাংলাকে নিয়ে কোনও আবেগ নেই। তাঁরা কেবল নামেই ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্যাডার অফিসার, অথচ শুধু নিজেদের কেরিয়ার আর পদোন্নতি নিয়ে ব্যস্ত। আর যাঁদের কাজের আগ্রহ রয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ আবার বাঙালি মনকে বুঝতে পারেন না বা ঠিকমতো কমিউনিকেট করতে পারেন না।
গত কয়েক মাস ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও হয়তো তেমনটাই অনুভব করছিলেন। এমন নয় যে বর্তমানে যে অবাঙালি আমলারা রয়েছেন, তাঁরা সকলেই অকর্মণ্য। অনেকেই রয়েছেন যাঁরা খুবই পারদর্শী এবং দুঁদে আমলা বা পুলিশ কর্তা। কিন্তু এও ঠিক, সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে, তা সরকার ও শাসক দলের অনেকের কাছে ধরা পড়ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর এও মনে হচ্ছিল, অতিশয় অবাঙালি প্রভাবে কোথাও যেন কলকাতা তাঁর আইডেনটিটিও হারিয়ে ফেলছে। সম্প্রতি আমলাদের নিয়ে এক বৈঠকে এবং পরে সাংবাদিক বৈঠকে সে কথা পরিষ্কার করে বলেওছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সাত সতেরো এই সব ভাবনার মধ্যেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেল। আরজি কর কাণ্ডকে কেন্দ্র সামগ্রিক ভাবে সরকার যখন সমালোচনার মুখে পড়েছে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে নবান্নের অবস্থান ও বার্তা পৌঁছে দিতে বাঙালি আমলা ও পুলিশ কর্তাদের বেছে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সূত্রের খবর, এটা শুরু। আগামী দিনে এই ব্যবস্থার একটা ধারাবাহিকতা দেখা যাবে। তবে আপাতত যে তিনটি মুখকে দেখা গেল, তাঁরা হলেন প্রাক্তন মুখ্য সচিব তথা মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্য পুলিশের এডিজি দক্ষিণবঙ্গ সুপ্রতিম সরকার এবং কলকাতা পুলিশের ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়।
মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতিপূরণের একটা চেষ্টা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভা ভোটের পর থেকেই শুরু করেছেন। লোকসভা ভোটে বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতেছে। তা নতুন করে বল দেয় শাসক দলকে। ভোটের পর থেকে দেখা যায়, অনেক বেশি করে আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে এগিয়ে দিচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। অবশ্য আলাপনই কেন, তা নিয়ে আবার কেউ কেউ সমাজমাধ্যমে প্রশ্ন তুলছিলেন ঠিকই। কিন্তু প্রাক্তন আমলাদের মতে, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে সরকারের অবস্থান ও সিদ্ধান্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে কোনও ভ্রান্তি নেই। এই দৃষ্টান্ত কেন্দ্রের উপর্যুপরি সরকারে ভুরি ভুরি রয়েছে। তা ছাড়া ভুলে গেলে চলবে না আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় নিতান্তই কোনও রাজনৈতিক নিয়োগ তথা পলিটিক্যাল অ্যাপয়ন্টি নয়। তিনি প্রাক্তন মুখ্য সচিব। প্রশাসনিক বিষয়ে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সহজ করে বিষয় ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে তাঁর দক্ষতা বাম জমানাতেও সমাদৃত হত।
তবে সাম্প্রতিক যে কৌশলগত পরিবর্তন ঘটেছে, তার একটা অনুঘটক রয়েছে। আরজি কর কাণ্ডের পর কলকাতার পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন। সেই সাংবাদিক বৈঠকে বিনীত যেভাবে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন, তা সরকার ও শাসক দলের অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাঁদের মতে, আরও নমনীয় হয়ে কথা বলা উচিত। সরকার যে তদন্তে ফাঁক রাখতে চায় না কিংবা কাউকে আড়াল করতে চায় না এবং সরকারও যে দ্রুত তদন্ত ও বিচার চায় সেই বার্তা সেদিনের সাংবাদিক বৈঠক থেকে আরও ভাল করে তুলে ধরা যেত।
নবান্ন সূত্রের মতে, ওই ঘটনার পরই সরকার ও দলের মধ্যে মন্থন শুরু হয়। দল ও সরকারের শীর্ষ নেতারা এ ব্যাপারে একমত যে, আরজি কর কাণ্ডের পর মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তা প্রশমন করতে গেলে অনেক বেশি বিশ্বাসবর্ধক পদক্ষেপ করতে হবে। এবং সেই পদক্ষেপের জন্য অন্যতম অপরিহার্য বিষয় হল মানুষের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখা। সরকারের ভাবনা ও দর্শন মানুষকে বোঝানো।
এর পরই সোমবার থেকে দেখা যায়, এডিজি দক্ষিণবঙ্গ সুপ্রতিম সরকার এবং কলকাতা পুলিশের ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করানো হচ্ছে। এডিজি আইনশৃঙ্খলা মনোজ ভার্মাও ওই সাংবাদিক বৈঠকে ছিলেন ঠিকই। কিন্তু দীর্ঘ সময় নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন সুপ্রতিম ও ইন্দিরা।
মঙ্গলবার নবান্ন অভিযানের পর বুধবার ১২ ঘণ্টা বাংলা বনধের ডাক দিয়েছে বিজেপি। সরকার যে সেই বনধ মানছে না, সে ব্যাপারে আবার এদিন সরকারের সিদ্ধান্ত পড়ে শোনান আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, এটা একটা ইতিবাচক পরিবর্তন বইকি। এখন দেখার এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে মানুষের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক সরকার সত্যিই মজবুত করতে পারে কিনা।