দ্য ওয়াল ব্যুরো: মালাবার হিলসে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি আবাসে যাবেন না উদ্ধব ঠাকরে, তিনি থাকবেন তাঁদের পারিবারিক বাড়ি মাতুশ্রীতেই। একসময় এই বাড়ি থেকেই মহারাষ্ট্রের শাসন নিয়ন্ত্রণ করেছে ঠাকরে পরিবার, তবে সরাসরি কোনও প্রশাসনিক পদে থেকে নয়। এখন উদ্ধব ঠাকরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও থাকবেন তাঁর বাবা বালাসাহেবের তৈরি বাড়িতেই। মুখ্যমন্ত্রীর অফিসের প্রধান বৈঠক তিনি করবেন মন্ত্রালয়ের সপ্তম তলে।
১৯৬০-এর দশকের গোড়ায় উদ্ধব ছিলেন স্কুলছাত্র। সেই সময়ই বান্দ্রা ইস্টের কলানগরে পারিবারিক বাড়িতে উঠে যান বালাসাহেব ঠাকরে। ১৯৬৬ সালের ১৯ জুন দাদারের রানাডে রোডে ঠাকরেদের বাসভবনে প্রতিষ্ঠা হয় শিবসেনার। তবে বান্দ্রায় যে বাড়ি করেন বালাসাহেব, সেখানে এসেছেন তাবড় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা, বলিউডের সব নামী তারকারা এবং ভারত-পাকিস্তানের সেরা ক্রিকেটাররা। আর আজও পর্যন্ত সেখানে শিবসৈনিকদের আনাগোনা তো লেগেই রয়েছে।
১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে শিল্পী-কলাকুশলী-লেখকদের আবাসন তৈরির জন্য বান্দ্রা ইস্টে মিঠি নদীর ধারে জমি দেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ভিপি নায়েক, তিনি আবার শিবসেনার প্রধান প্যাট্রন বলে পরিচিত। বালাসাহেব ঠাকরে এখানে জমি পেয়েছিলেন কার্টুনিস্ট এবং মার্মিক নামে একটি সাপ্তাহিকের সম্পাদক হিসাবে।
বালাসাহেবের মায়ের নাম ছিল রমাবাই, তাঁর স্মৃতিতেই তিনি এই বাড়ির নাম দেন মাতুশ্রী। একতলা এই বাড়িতে এসেই বাড়ির বাইরে একটি তুলসীগাছ লাগান বালাসাহেবের স্ত্রী মীনাতাই। পরে এই বাড়ি তিনতলা হয়। ১৯৯০ সালে যখন এই বাড়ি সংস্কার করা হয়, তখন বালাসাহেব স্পষ্ট ভাবে নির্দেশ দেন, ওই তুলসীগাছ কেউ যেন স্পর্শও না করে।
এই বাড়ির টেরেসে বসেই তাঁর বন্ধু দিলীপ কুমারের সঙ্গে ছোলা খেতে খেতে বিয়ারে চুমুক দিতেন বালাসাহেব। তবে দিলীপ কুমার যখন পাকিস্তানের নাগরিক সম্মান নিশান-ই-পাকিস্তান গ্রহণ করেন, তখন রেগে আগুন হয়ে গিয়েছিলেন বালাসাহেব।
বাড়ির একতলাতেই সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে দেখা করতেন বালাসাহেব। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে ১৯৯৩ সালে তাঁর সঙ্গে দেখা করে অনেকেই সাম্প্রদায়িক হিংসা বন্ধ করার অনুরোধ করেন। পাকিস্তানের ভারত সফরের বিরোধিতা করে বিসিসিআই অফিস ভাঙচুর করেন ক্রুদ্ধ শিবসৈনিকরা। তখনও একই রকম উদ্বেগ নিয়ে বালাসাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যান তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আডবাণী। তবে ব্যতিক্রমী লোকজনও এসেছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। ২০০৫ সালে ‘হিন্দুহৃদয় সম্রাট’ বালাসাহেব ঠাকরের সঙ্গে দেখা করতে আসেন পাকিস্তানের ক্রিকেটার জাভেদ মিঁয়াদাদ।
এই বাড়িতে দিনরাত আসা-যাওয়া লেগেই থাকে শিবসৈনিকদের। প্রতিবছর গুরুপূর্ণিমার দিন তো সারাদিন লোকের লাইন লেগে থাকে। তাঁরা আসতেন ‘সাহেব’ ও মীনাতাইয়ের আশীর্বাদ নিতে, মীনাতাইও মাতৃস্নেহ সকলকে আপ্যায়ন করতেন। লোক আসার ঢল বেড়ে যায় ১৯৯৫ সালে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ক্ষমতায় আসতে। এমনও ঘটেছে যে মুখ্যমন্ত্রী মনোহর জোশীকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় এনরনের আধিকারিক রেবেকা মার্কের জন্য, মার্ক এসেছিলেন এই বাড়ির মালিকের সঙ্গে দেখা করতে।
১৯৯৬ সালে তাঁর বাড়ির টয়লেট ব্যবহার করেছিলেন মাইকেল জ্যাকসন, আর সেটাও সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল।
২০১২ সালে বালাসাহেবের মৃত্যুর পরে শিবসৈনিকদের চিন্তা ছিল, এবার মাতুশ্রীর প্রভাব কতটা খাটবে। উদ্ধব খুশি হয়েছিলেন যখন লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ তাঁর সঙ্গে দেখা করে জোট পোক্ত করেন। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের পরে যখন বিজেপি তাঁর সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করছে এবং মুখ্যমন্ত্রী পদ বাঁটোয়ারা নিয়ে ‘প্রতিশ্রুতি’ রাখছে না বলে শিবসেনা প্রচার শুরু করে তখন আর তাঁর বাড়ির বাইরে গেরুয়া শিবিরের লাইন দেখা যায়নি।
মাতুশ্রীতে স্ত্রী রশ্মি এবং দুই ছেলে আদিত্য ও তেজসকে নিয়ে বালাসাহেবের তৈরি বাড়িতে থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন উদ্ধব। শপথ নেওয়ার পরে তিনি তাঁর প্রয়াত পিতা বালাসাহেবের ঘরে ঢুকে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন। আর এই জায়গাটার সঙ্গে শিবসৈনিকরাও অনেক বেশি একাত্ম বোধ করেন। তাই মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ছেড়ে মাতুশ্রীতেই থাকবেন বলে স্থির করেছেন উদ্ধব ঠাকরে।