দ্য ওয়াল ব্যুরো: লকডাউন শুরু হওয়ার পরে একধাক্কায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছিল কনডোমের বিক্রি। এমনটাই জানা গেছিল পরিসংখ্যানে। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়েছিল। শুধু কনডোমই নয়, বেড়েছিল কনট্রাসেপ্টিভ পিলের বিক্রিও। কিন্তু মার্চের শেষ থেকে শুরু করে এপ্রিল মাস জুড়ে লকডাউন চলার পরে যখন ফের তৃতীয় দফায় বাড়ল লকডাউনের মেয়াদ, ততক্ষণে আবার অনেকটা কমে গেছে কনডোমের বিক্রি।
এমনটাই বলছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। শুধু কনডোম নয়, পাশাপাশি কমে গেছে কনট্রাসেপ্টিভ পিলের বিক্রিও। এবং বিক্রির এই হ্রাসের গ্রাফ বেশ দ্রুত পড়েছে এপ্রিল মাসে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি লকডাউনে সেক্স করে করে সেটা একঘেয়ে হয়ে গেল দেশের সাধারণ মানুষের কাছে? তাই আপাতত কনডোমের চাহিদা ফুরিয়েছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটা মোটেও সত্যি নয়। লকডাউনের কড়াকড়ির কারণেই অনেকে দোকানে গিয়ে কিনতে পারছেন না কনডোম। আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাঁরা একসঙ্গে থাকেন, তাঁরা চট করে হোম ডেলিভারির জন্য অর্ডারও করতে পারেন না। এর ফলেই কমেছে কনডোম ও পিলের বিক্রি। বিশেষজ্ঞরা এই ভয়ও পাচ্ছেন, কনডোমের বিক্রির এই পতন প্রচুর পরিমাণে অযাচিত গর্ভধারণের কারণ হয়ে উঠতে পারে লকডাউনের সময়ে। এর জেরেই ঘটতে পারে অসংখ্য ঝুঁকির গর্ভপাত।
ওষুধের মতোই কনডোম এবং এই বিশেষ পিলগুলিও জরুরি পরিষেবার মধ্যেই পড়ে এবং বহু ফার্মেসি ও দোকান লকডাউনের সময়ে হোম ডেলিভারির সুবিধাও চালু রেখেছে। কিন্তু ভারতীয় সাধারণ সমাজে যেখানে যৌনতা বিষয়টিই কখনও খোলাখুলি আলোচিত হয় না, সেখানে হোম ডেলিভারি করে কনডোম বা পিল আনানো এখনও খুব একটা স্বাভাবিক রীতি নয়, আছে হাজার সামাজিক ও মানসিক বাধা।
ম্যানফোর্স ব্র্যান্ডের কনডোম এবং আনওয়ান্টেড ৭২ পিল প্রস্তুতকারক সংস্থা 'ম্যানকাইন্ড ফার্মা'র চিফ অপারেটিং অফিসার অর্জুন জুনেজা এ বিষয়ে বলেন, "বিক্রি সত্যিই অনেকটা কমে গেছে। হয়তো অনেকেই আগে থেকে স্টক করে রেখেছিলেন বা অনেকে বেরোতে পারছেন না বলে কিনতে পারছেন না। কিন্তু সেটা যাই হোক, জন্মনিরোধক বিক্রির হ্রাস চোখে পড়ার মতো।"
একই কথা শোনা গেল 'অল ইন্ডিয়া অর্গানাইজেশন অফ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট'-এর সাধারণ সম্পাদক রাজীব সিংহলের গলায়। সারা দেশের সাড়ে আট লক্ষ কেমিস্ট এই সংগঠনের সদস্য। রাজীব বলেন, "কনডোম, ওষুধ বা অন্যান্য জন্মনিরোধক যা যা আছে, তার সবকিছুরই বিক্রি ভীষণ ভাবে কমেছে এপ্রিল মাস জুড়ে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন জিনিস ধরে দেখতে গেলে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে এগুলির বিক্রি। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধের দোকানে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কনডোম তো কেউ প্রেসক্রাইব করে না, ফলে এটা একটা কারণ হতে পারে। আবার ওষুধের দোকানে নানা রকম রোগীর ভিড়, সেই ভয়েও অনেকে এড়াতে পারেন ফার্মাসি।"
শুধু তাই নয়। চিন্তা বাড়িয়েছে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে পরিবার পরিকল্পনার কেস কম আসাও। পাটনার এক স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ অনিতা সিংহ জানিয়েছেন, লকডাউনের সময়ে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক আলোচনা করতে আসছেনই না দম্পতিরা। এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, "হয়তো এটা এই মুহূর্তে জরুরি মনে করছেন না অনেকেই।"
'দ্য ফাউন্ডেশন ফর রিপ্রোডাকটিভ হেল্থ সার্ভিসেস ইন্ডিয়া' সংস্থার তরফে আয়োজিত একটি সমীক্ষা বলছে, এই বছরের ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিবার পরিকল্পনা বিষয়টি এভাবেই ব্রাত্য থেকে যেতে পারে। আড়াই কোটিরও বেশি দম্পতি জন্মনিরোধক ব্যবস্থার সুবিধাই নিতে পারবে না সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অন্যান্য বছরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রায় সাত লক্ষ পুরুষের স্টেরিলাইজেশন স্থগিত হয়েছে লকডাউনেক কারণে। প্রায় ১০ লক্ষ মহিলা বন্ধ্যত্ব অপারেশন কম করিয়েছেন অন্য বছরের তুলনায়।
তথ্য বলছে, প্রায় ২৪ লক্ষ অযাচিত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটতে পারে এই বছরে। গর্ভপাত করানো হতে পারে সাড়ে ১৪ লক্ষ মহিলার। এর মধ্যে আঠ লক্ষেরও বেশি মহিলা বাধ্য হয়ে যাবেন হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে, প্রায় বিনা পরিকাঠামোয় গর্ভপাতের ঝুঁকি নিতে বাধ্য হবেন।
'দ্য ফাউন্ডেশন ফর রিপ্রোডাকটিভ হেল্থ সার্ভিসেস ইন্ডিয়া'র সিইও ভিএস চন্দ্র শেখর জানিয়েছেন, কোভিডের ভীতির সঙ্গে এই গোটা পদ্ধতি জুড়ে রয়েছে। এটা কবে স্বাভাবিক হবে, কেউ জানে না। "শেষ কয়েক সপ্তাহ ধরে জন্মনিরোধকের বিক্রি অনেক কমে গেছে। এটা বেশ উদ্বেগের কারণ।"-- বলেন তিনিও।