
শেষ আপডেট: 3 May 2025 16:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিলীপ ঘোষ৷ (Dilip Ghosh) বিজেপিতে (BJP) আর ক’দিন? বিয়ের পর তাঁকে নিয়ে এই প্রশ্ন মুখে মুখে। দলেরই অনেকে বলছেন তিনি আরএসএস (RSS)-এর বিবাহ-বিধি ভেঙেছেন। দলীয় সতীর্থদের কারও কারও মতে, ষাট পেরনো দিলীপের বিয়ে করার সিদ্ধান্তে দলের অনুশাসন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষের অনুগামীদের একাংশ বলছেন, রাজ্য বিজেপিতে এখন দেওয়ালে কান পাতলে নারী ঘটিত কেলেঙ্কারির কাহিনি শোনা যায়। প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথাগত রায় (Tathagata Roy, Former BJP President, West Bengal) রাজ্য বিজেপির নেতাদের বিরুদ্ধে নারী ঘটিত কেচ্ছা কেলেঙ্কারির যে সব অভিযোগ তুলেছেন তার অনেকটাই সত্যি। সেদিক থেকে দিলীপ ঘোষ পরিচ্ছন ব্যক্তি। তিনি দলের কোনও মহিলা নেত্রীকে কখনও পার্টির নিজের গাড়িতে তুলতেন না। রিঙ্কু মজুমদার (Rinku Majumder, BJP leader & wife of Dilip Ghosh) পাশের আসনে বসছেন বিয়ের পর।
তিনি বিজেপির মহিলা মোর্চার নেত্রী। অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষ খাতায় কলমে দলে কোনও পদে না থাকলেও জনমনে তিনিই বঙ্গ-বিজেপির এক নম্বর মুখ এবং সর্বদা ঘটমান বর্তমান। বঙ্গ রাজনীতিতে তিনি প্রাতঃভ্রমণে রাজনীতি বা ‘পলিটিক্স ইন মর্নিংওয়াক’ (politics in morning walk)-এর স্রষ্টা তিনি। তাঁর বাইট নিতে ভোরে বিছানা ছাড়েন টিভি ক্যামেরার ভিডিওগ্রাফারেরা।
সেই দিলীপ ঘোষের তৃণমূলে যোগদানের সম্ভবনা নিয়ে আলাচনা জোরদার হয়েছে দিঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনে স্বস্ত্রীক হাজির হওয়ার পর। আমন্ত্রণ পেয়েও বিজেপির আর কোনও নেতা সেখানে না গেলেও সৌজন্য রক্ষা এবং মন্দির দর্শনের কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক মঞ্চে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন তিনি। বিজেপির ভিতরে-বাইরে গুঞ্জন দিলীপের দিঘায় যাওয়ার পিছনে কাজ করেছে নববধূ রিঙ্কুর তাড়না। বিয়ের পর তীর্থ করা আর নতুন মন্দির দর্শন এক সঙ্গে সেরে নিতে দিলীপকে পরামর্শ দেন তিনিই। অনেকে মনে করছেন, বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি শেষ পর্যন্ত দল ছাড়তে বাধ্য অথবা পার্টি তাঁকে তাড়িয়ে দিলে জোড়াফুল শিবিরমুখী হলে তাতেও প্রেরণার, পরামর্শের ভূমিকায় থাকবেন রিঙ্কু।
যদিও তাঁর সম্পর্কে এই প্রচার ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছেন দিলীপ পত্নী। তাঁর কথায়, দিঘায় যাওয়ার আগের রাতে উনি (দিলীপ ঘোষ) ছিলেন মুর্শিদাবাদে। আমি ফোনে বলেছিলাম কী ধরনের অপপ্রচার চলছে। শুনে উনি বললেন, যে যা বলে বলুক। সৌজন্য ভদ্রতা বলে একটা বিষয় আছে। চেষ্টা করব যাওয়ার। দিলীপ ঘোষ শেষ পর্যন্ত স্ত্রী'কে নিয়ে গিয়েছিলেন।
দিলীপের সঙ্গে সত্যিই দলের কোনও দিন বিচ্ছেদ হবে কিনা সে সব ভবিষ্যতের বিষয়। তবে দিলীপ-রিঙ্কুর বিয়ের সুবাদে বহু বছর পর বঙ্গ-রাজনীতি আরও এক দম্পতি পেল যাদের পরিচয় দলীয় রাজনীতি সুত্রে। এমন দৃষ্টান্ত যদিও কম নয়। যদিও দাম্পত্য জীবন সামলে একত্রে রাজনীতি করার নজির ধীরে ধীরে কমে আসছে। বিশেষ করে একটা সময় সুভাষ-রমলা, প্রিয়-দীপা, সুদীপ-নয়নারা যেমন রাজনীতির সরণিতে দাগ কেটেছেন। আরও আগে সিপিআইয়ের জ্যোতি ভট্টাচার্য, সিপিএমের শ্যামল চক্রবর্তীরা একত্রে পার্টির কাজ করেছেন।
দিলীপ পত্নী রিঙ্কু জানাচ্ছেন, তিনি পুরোদস্তুর রাজনীতিপ্রেমী মানুষ। তাঁর কথায়, 'রাজনীতি তো করবই। দু'জনেই করব। রাজনীতির সঙ্গীই থাকব। তবে কীভাবে করব সেটা ভবিষ্যৎ বলবে।'
দিলীপ ঘোষের মতোই বেশি বয়সে বিয়ে করেছিলেন কংগ্রেসের সোমেন মিত্র। তবে স্ত্রী শিখাকে সর্বদা পাশে দেখা যেত না। দিলীপের মতোই সোমেনের বিয়ের খবর আচমকা প্রকাশ পেয়েছিল। আর সুদীপ-নয়নার বিয়ের খবর বলতে গেলে কলকাতার এক দৈনিকে ছাপার আগে দলের কেউই তেমন একটা জানতে পারেননি।
নাট্য অভিনেত্রী দীপা দাশমুন্সীর সঙ্গে প্রয়াত প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির বিয়ে হয় ১৯৯৪-এ। ধীরে ধীরে দীপা কংগ্রেসি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রয়াত প্রিয়রঞ্জনের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে একসঙ্গে দেখা গেলেও তাঁরা সুভাষ-রমলার মতো দলের কর্মসূচিতে ছায়াসঙ্গী ছিলেন না। প্রিয়রঞ্জনের দীর্ঘ অসুস্থতা সত্ত্বেও কংগ্রেসের মতো জাতীয় দলে দীপার উত্থান ও মর্যাদা প্রাপ্তি প্রমাণ করে অভিনয়ের মতো রাজনীতিও তাঁর রক্তে আছে। প্রিয়রঞ্জনোর মতো দীপাও কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হয়েছেন।
সুদীপ বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ের পর রাজনীতির মূল স্রোতে এসেছেন নয়না বন্দোপাধ্যায়। সুদীপের সঙ্গেই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে গিয়েছেন। দম্পতি রাজনীতিক হিসাবে সুদীপ নয়নাই এখন বঙ্গ রাজনীতিতে সবচেয়ে সক্রিয়। তবে সুভাষ রমলার মতো কাঁধে কাঁধ রেখে রাজনীতি করার দৃষ্টান্ত মূল ধারার রাজনীতিতে প্রায় দু দশক অনুপস্থিত। ২০০৯-এ সুভাষ চক্রবর্তীর প্রয়ানে তাতে ইতি পড়ে গিয়েছে।
সিপিএম নেত্রী রমলা চক্রবর্তী তাই রিঙ্কুর উদ্দেশে বলেছেন, ‘ওঁর সঙ্গে পরিচয় হয়নি। যতটুকু যা জেনেছি কাগজ পড়ে। তাঁর উদ্দেশে বলব যে মতাদর্শেই বিশ্বাস করুন না কেন, রাজনীতিটা ছাড়বেন না।’
বাংলার রাজনীতিতে সুভাষ-রমলা শুধু রাজনীতির জুটি নয় দলীয় কর্মসূচিতেও তাঁরা ছিলেন ছায়াসঙ্গী। প্রয়াত সুভাষ চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর সময়ে সিপিএমের বহু পরিচিত এবং দল ও দলীয় বৃত্তের বাইরে তুমুল জনপ্রিয়। আর পাঁচজনের মতো রমলাও মাঝেমধ্যে তাঁকে ‘সুভাষদা’ বলে সম্মোধন করতেন। ‘সেই সব দিনে দলের এমন কোনও কর্মসূচি ছিল না যেখানে সুভাষদা আছে, রমলাদি নেই’, বলছিলেন এক প্রবীণ সিপিএম নেতা। রমলার কথায়, দলের নানা বিষয়ে আমাদের নিয়মিত আলোচনা হত। তবে সেটা স্বামী-স্ত্রী হিসাবে নয়, পার্টির সহযোদ্ধা হিসাবে। ফলে তর্ক জুড়ে যাওয়াটা ছিল খুব স্বাভাবিক।
সিপিএমের অন্দরের খবর, রমলার জন্যই ২০০০ সালে সিপিএম ছাড়তে চেয়েও পারেনননি সুভাষ চক্রবর্তী। সিপিএম থেকে পেরিয়ে পিডিএস গড়ার সময় সমীর পুততুণ্ড, সৈফুদ্দিন চৌধুরীরা সুভাষ চক্রবর্তীকে সামনে রেখেই এগতে চেয়েছিলেন। রমলা অবশ্য বলছেন, সুভাষদা পার্টি ছাড়তে চাননি। কেন ছাড়বেন? সিপিএমকে তীল তীল করে গড়ে তোলার তিনিও এক সৈনিক। তবে রাজনৈতিক দলে মনোমানিল্য, মতভেদ হয়। সুভাষদাকে কেউ কেউ পাশে চেয়েছিল। আর পাঁচটা ইস্যুর মতো এই ব্যাপারেও আমি আমার মত দিয়েছি।