দ্য ওয়াল ব্যুরো: ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে তাঁদের প্রাকৃতিক চিকিৎসা ও নিরাময় বহুবার নজর কেড়েছে সংবাদমাধ্যমের। শুধু ম্যালেরিয়া নয়, যে কোনও অসুখবিসুখকেই নাকি খুব সহজে হার মানাতে পারেন তাঁরা। আজ নয়, বহু বছর ধরেই এমনটাই চলছে। এ দেশেরই এক পরিচিত রাজ্যের অংশ হলেও, এখনও যেন রহস্য আর ধোঁয়াশার পর্দা মোড়া রয়েছে এই জায়গা ঘিরে।
এর কারণ মূলত দুটো। এক, মাওবাদীদের ডেরা হিসেবে এ এলাকা কুখ্যাতি লাভ করেছে বিগত কয়েক দশক ধরে। আর দুই, এই এলাকায় এমন কিছু আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত জায়গা আছে, যেখানকার জীবন ও যাপন থেকে গোটা দেশ যেন বিচ্ছিন্ন। তাদের অনটন ও তার মোকাবিলার লড়াই এখনও অজানা বহু মানুষের।
ছত্তীসগড়ের বস্তার জেলা বাকি দেশের চোখে খানিকটা এমনই।
এই মহামারীর সময়ে কেমন আছে বস্তার? এখানকার একটা বড় অংশে নেই শহুরে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ। শিক্ষার সুযোগও নেই, নেই দু'বেলা পেট ভরে খাওয়াও। সম্পূর্ণ তথ্যও পৌঁছয় না সেখানে। তাহলে কীভাবে করোনার মোকাবিলা করছে মানুষগুলি? অন্য নানা অসুখের মতোই এই অসুখকেও এখনও পর্যন্ত রুখে দিয়েছে বাস্তার। এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি প্রাকৃতিক ভাবেই তারা এ মহামারীর সঙ্গে লড়ছে। এমনিতেই এই এলাকা নানা খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। জানা যায়, ছত্তীসগড়ের স্বাস্থ্য দফতরকেও এই প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে খানিক হাত মেলাতে হয় প্রত্যন্তে। এখন, করোনা মহামারীর সময়েও সেই প্রাচীন পদ্ধতির ওপরেই ভরসা করছে বস্তার।

তথাকথিত সভ্যতা ও উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকা এই বস্তারে রাজত্ব করেন প্রকৃতি মা। অরণ্য প্রধান এই অঞ্চলটি রীতিমতো ঔষধি গাছের খনি। হাসপাতাল নেই, চিকিৎসক নেই-- তবু গাছগাছড়া হোক কিংবা লাল পিঁপড়ে, তাই দিয়েই বড় বড় রোগের সঙ্গে মোকাবিলা করে এসেছেন বস্তারবাসী। লাল পিঁপড়ে দিয়ে চিকিৎসা সেখানকার একটি বহু প্রাচীন এবং জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতি। করোনার সময়ে কাজে লাগছে সেটিও।
জানা গেছে, সেখানকার প্রায় প্রতিটি গাছেই পিঁপড়ের বাসা থাকে। কেউ অসুস্থ হলে তাঁর কান-মাথা কাপড় দিয়ে ভাল করে ঢেকে তার পরে তাঁর শরীরে সেই লাল পিঁপড়ের বাসা ছেড়ে দেওয়া হয়। বেশ কিছুক্ষণ পিঁপড়ের গোটা দলটি রোগীর সারা দেহে কামড়ায়। তাতে নাকি বহুক্ষেত্রে সাড়া মেলে। স্থানীয় বিশ্বাস, শরীর থেকে সবরকম বিষ বার করে নেয় পিঁপড়েরা। শোনা যায়, এক সময়ে সমস্ত রকম চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পরে অনেক ম্যালেরিয়া রোগী এই লাল পিঁপড়ের কামড়ে সেরে উঠেছেন ওই অঞ্চলে।
এই পিঁপড়ে নিয়ে মুখে মুখে ঘোরে এক কাহিনিও। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মানের ব্রিটিশ শেফ গর্ডন রামসে নাকি এই বস্তারে এসে লাল পিঁপড়ের চাটনি খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আদা-রসুন-ধনে-মরিচ দিয়ে তৈরি এই লাল পিঁপড়ের চাটনি সেখানে রীতিমতো জ্বরের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২০১৫ সালে দুই চিকিৎসক বিজ্ঞানী ভিভি বিধু ও ডিএ ইভানসের গবেষণা থেকে জানা যায়, বস্তারের এক বিশেষ প্রজাতির লাল পিঁপড়ের দেহে বেশ কিছু রাসায়নিক পাওয়া যায়, যা সত্যিই অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে। এমনকি এর জীবাণুনাশক ভূমিকাও আছে। তাই বস্তারে লাল পিঁপড়ের দেহ থেকে বানানো তেলেরও বেশ প্রচলন আছে।
তথ্য বলছে, প্রতি বছর প্রতি হাজার জনের মধ্যে ১০ জন এখনও ম্যালেরিয়ায় ভোগেন বস্তারে। স্বাস্থ্যবিভাগের চেষ্টা সত্ত্বেও এই রোগকে পুরোপুরি বাগে আনা যায়নি। তাই এই প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির ওপরেই সকলকে ভরসা করতে হয়।

এমনকি সরকারি স্বাস্থ্য আধিকারিকরাও গ্রামীণ চিকিৎসক এবং পুরোহিতদের আস্থাকে ব্যবহার করেই সেখানে চিকিৎসার কাজ করেন এখনও। ব্লক স্তরের মেডিক্যাল অফিসার ডিকে বিষান জানালেন, বস্তারের মানুষ গ্রামীণ চিকিৎসকদের ভরসা করেন খুব বেশি। তাই তাঁদের মারফতই মানুষকে নিকটস্থ হাসপাতালে পাঠানো হয় খুব বাড়াবাড়ি হলে।
তবে করোনা আক্রমণের বিরুদ্ধে এই মিলিত প্রয়াস কতটা কার্যকরী হবে তা বলা কঠিন ! যদিও বস্তারে এখনও কোনও সংক্রমণের খবর নেই, তবে সম্প্রতি গোদাবরী উপত্যকার পাশে লঙ্কা ক্ষেতে কর্মরত আদিবাসীরা লকডাউনের মাঝেই বনের মধ্যে দিয়ে গ্রামে ফিরেছেন। কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে তাঁদের। নিরাপদ সময় পেরোয়নি এখনও, তাঁদের নিয়ে আশঙ্কায় আছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

প্রায় সাড়ে তিন হাজার গ্রামীণ চিকিৎসককে নিয়ে তৈরি ছত্তীসগড়ের গ্রামীণ চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশন এর প্রতিষ্ঠাতা নির্মল অবস্থি জানান, তাঁরা এই মহামারী সম্পর্কে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছ থেকে কোনও বিশেষ পরামর্শ পাননি এখনও। তাই তাঁরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সচেতনতা তৈরি করছেন। মাস্ক ব্যবহারের কথা বলছেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলছেন। মাস্কের অভাবে বহু আদিবাসী নাকমুখ ঢেকে রাখছেন পাতা দিয়ে।
ছত্তীসগড়ের প্রাক্তন স্বাস্থ্যকর্তা প্রবীর চট্টোপাধ্যায়ের মতে, করোনার মতো মহামারীর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য দফতরের সহ্গে গ্রামীণ চিকিৎসকদের একটা সমন্বয় প্রয়োজন। নইলে বিপদের আশঙ্কা এবং বিভ্রান্তি থেকেই যাবে। যদিও জানা গেছে, গোটা রাজ্যে কয়েক হাজার মহিলা স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা সচেতনতা প্রচার চলছে গ্রামে গ্রামে। বাঁশি বাজিয়ে মানুষকে সচেতন করছেন তাঁরা।

কিন্তু অনেকেই মনে করছেন, সেটুকু যথেষ্ট নয়। কারণ প্রত্যন্ত গ্রামবাসীরা স্বভাবসুলভ কারণেই সব কথা শুনবেন না, ভরসা করবেন গ্রামীণ চিকিৎসকদের উপরেই। তাই এই সচেতনতা কর্মসূচিতে তাঁদেরও সঙ্গে নিলে ভাল হয় বলে মনে করছেন অনেকে।
লকডাউনের পরে এ নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।