
বাম ও কংগ্রেসের যুক্তফ্রন্টই সময়ের দাবি।
শেষ আপডেট: 20 June 2024 09:12
আগামীকাল ২১ জুন। ১৯৭৭ সালের এই দিনে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার যাত্রা শুরু করেছিল। সেই দিনটিকে জোটেরও জন্মদিন হিসাবে পালন করা হয়।
এক-দেড় দশক আগেও পশ্চিমবঙ্গে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করত। কলকাতায় শহিদ মিনারে, জেলায় জেলায় সমাবেশের আয়োজন করে বামফ্রন্টের শরিক দলগুলি জোটের জন্ম বৃত্তান্ত তুলে ধরত। তিন বছর পর বামফ্রন্ট পঞ্চাশে পা দেবে। ধরে নেওয়া যায় বিগত বছরগুলির মতো এবারও বামফ্রন্টের নেতারা তাঁদের ৩৪ বছর ক্ষমতাসীন সরকারের স্মৃতিচারণা করবেন। ২০১১ থেকে এই ধারা চলে আসছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকারের কর্মসূচির বিপরীতে বামফ্রন্ট সরকার কত বেশি জনকল্যাণমূলক কাজ করেছে তার খতিয়ান তুলে ধরা। ঘটনা হল, ২০১১ পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে বামফ্রন্টের ভোট কমতে কমতে এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। নির্বাচনে হার-জিৎ থাকবেই। কিন্তু ভোটে হেরে বছর বছর ভোট বাক্সে তলানিতে ঠেকার এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
সিপিএমের প্রয়াত রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস একদিন দম্ভভরে দাবি করেছিলেন, বামফ্রন্ট কম করে ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকবে। খুব যে ভুল বলেছিলেন বলা যাবে না। ৩৪ বছর টানা টিকে থাকাই বা কম কী! সত্যি কথা বলতে কী, রাজনীতির বৃত্তের বহু মানুষও একটা সময় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, বামফ্রন্ট সরকার ‘অমর’। ‘বামফ্রন্টকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে’, সিপিএম নেতা প্রমোদ দাশগুপ্তের এই কথাটি একটা সময় বাম নেতাদের মুখে মুখে ঘুরত। কিন্তু একটা বিষয় মানতে হবে যে প্রমোদ দাশগুপ্তের প্রজন্ম যে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ওই রকম একটা স্লোগানকে বাস্তবায়িত করতে পেরেছিলেন তা আজ নেই। এখন ধর্ম ছাড়া কোনও এক ভাবনায় বৃহৎ অংশের মানুষকে পরিচালিত করা কঠিন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ যে ভাবে উৎসাহ পাচ্ছে তা বাম- মনোভাবাপন্নদেরও প্রভাবিত করছে।
পশ্চিমবঙ্গে সেই জোট সরকারের অবদান নিয়ে কোটি কোটি শব্দ লেখা হয়েছে। অভিমতের স্পষ্ট দুটি ভাগ আছে। একদল মনে করে, ৩৪টা বছর স্রেফ অপচয় হয়েছে। এই মতের অনুসারীরা চান না বামফ্রন্টের প্রত্যাবর্তন হোক।
আর একদল মনে করে, আজকের পশ্চিমবঙ্গের যতটুকু যা অগ্রগতি তার মূলে রয়েছে বামফ্রন্ট সরকারের ভূমি সংস্কার অর্থাৎ গরিব মানুষকে চাষের জমি বণ্টন, বর্গাদার উচ্ছেদ আটকাতে সরকারি খাতায় তাদের নাম নথিভুক্ত করা, ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু, কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের মাধ্যমে অনাহারে মৃত্যু আটকানো, পঞ্চায়েত ও পুরসভার হাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি। এছাড়া কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসে জ্যোতি বসু, অশোক মিত্রদের আন্দোলনের সুফল তো আজ সব রাজ্যই ভোগ করছে।
মৌলিক অবদানগুলিকে স্বীকার করেও নিয়েও বলতে হয় যে, ৩৪ বছর ক্ষমতাসীন সরকারের সাফল্যের খতিয়ান যতটা দীর্ঘায়িত হওয়া উচিৎ ছিল তা হয়নি। কেন্দ্রের বঞ্চনা যেমন ছিল, তেমনই নিজেদের দূরদর্শিতা ও নিষ্ঠার অভাব, নেতা-কর্মীদের মধ্যে ‘আমরা নির্বিকল্প’ জাতীয় ভাবনা এবং সরকারের ভ্রান্তনীতিও ব্যর্থতার জন্য সমান দায়ী।
ফলে বামপন্থীদের সরকার হলেও গত শতকের নয়ের দশকের পর থেকে অন্য রাজ্যের দক্ষিণ ও অতি-দক্ষিণপন্থী দল শাসিত সরকারের সঙ্গে এ রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারের কর্মসূচিতে মৌলিক ফারাক তেমন ছিল না। বামফ্রন্ট সরকার টিকে ছিল শরিক দলগুলির নির্বাচনী কেরামতি এবং বিরোধীদের অনৈক্যের সুবাদে। তাই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ‘উন্নততর’ শব্দটি বামফ্রন্টের আগে যুক্ত করে বার্তা দিতে হয় বামফ্রন্ট শুধু ‘মানছি না, মানব না’ জাতীয় সংগ্রামের হাতিয়ার নয়, তারা উন্নয়নেও সমান মনযোগী হবে। বুদ্ধদেববাবু চেষ্টাও করেছিলেন যথাসাধ্য। তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের গোটা দশ বছরের কাজকর্ম নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছি। তিনি ছিলেন ‘হোল টাইমার মুখ্যমন্ত্রী’।
এতো গেল বামফ্রন্টের শাসনের একটি দিক। আর একটি দিক হল চূড়ান্ত অপশাসনের অভিযোগ। বিরোধীদের উপর দমনপীড়ন, পুলিশিরাজ, মানবাধিকারহরণ, রাজনৈতিক হিংসা, প্রধান শরিক সিপিএমের দাদাগিরি, সন্ত্রাস, পাড়া থেকে পরিবার—সর্বত্র পার্টিতন্ত্র কায়েমের ইতিহাসও জনমনে সমান জাগ্রত।
এই সব প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ, বামফ্রন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা মহলের উদ্বেগ, উৎকণ্টা। চব্বিশের লোকসভা ভোটে বাংলায় বহু মানুষের ধারণা ও প্রত্যাশা ছিল, সিপিএম তথা বামফ্রন্ট নির্বাচনী ময়দানে ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু তারা এবারও ব্যর্থ হয়েছে। ভোট আরও কিছুটা কমে যাওয়ায় এ রাজ্যে বাম-কংগ্রেস বিলুপ্তির পথে কি না, সে বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে বিধানসভা, লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। এ রাজ্যে বাম-কংগ্রেস এই ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। বিজেপি ও তৃণমূলের বাইনারি তারা ভাঙতে পারছে না। তৃতীয়পক্ষ মাথা তুলতে পারছে না মূলত সেই কারণেই। ফলে ব্যর্থতার সব দায় বাম-কংগ্রেসের নাকি, চলমান রাজনীতির চরিত্রও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী, সেই বিতর্ক এখানে টানছি না। ওডিশায় নবীন পট্টনায়েকের মতো জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রীর সরকারের পতন এবং বিজেপির ক্ষমতা দখল এই বাইনারি রাজনীতির ফল। ফলে বাংলার বাইনারি বা দ্বিমুখিতা তৃণমূলেরও বিপদের কারণ হতে পারে। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া হয়, তৃণমূলের জন্যও তেমনই ভবিষ্যত লেখা হয়ে আছে, তাহলে তাতেও বাম-কংগ্রেসের কোনও অবদান থাকবে না। এবারের লোকসভা ভোটের ফলেও স্পষ্ট, তৃণমূল বিরোধীরা বিজেপি’কে, বিজেপি বিরোধীরা তৃণমূলকে বেছে নিয়েছে।
গোটা দেশের ছবিটাও কম-বেশি একই। লোকসভা ভোটে অনেক রাজ্যেই তৃণমূলের মতো আঞ্চলিক দল ভাল ফল করেছে। লক্ষ্যণীয় হল তারা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ অথবা কংগ্রেসের উদ্যোগে গঠিত ইন্ডি জোটের শরিক ছিল। এই দুই শিবিরের বাইরে থাকা একদা শক্তিশালী দল তেলেঙ্গানার ভারত রাষ্ট্র সমিতি, অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআর কংগ্রেস, ওডিশায় বিজু জনতা দল, উত্তর প্রদেশে বিএসপি, পাঞ্জাবের অকালি দল এবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। অর্থাৎ বাইনারি শুধু দুটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, জোটকেও ভোটাররা একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। যেমন, নরেন্দ্র মোদী আরও শক্তিশালী সরকার গড়তে ভোট চাইলেন, অথচ মানুষ সংখ্যা আরও কমিয়ে দিয়ে তাঁকে জোট সরকার চালানোর চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিলেন।
এই বাইনারি কতদিন চলবে বলা মুশকিল। এই পরিস্থিতিতে ভোটের ময়দানে ঘুরে দাঁড়ানোর আগে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকা অনেক বেশি জরুরি। প্রশ্ন হল, বামফ্রন্টকে সামনে রেখে আর ভোটের আগে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে কি তা সম্ভব?
বামফ্রন্টকে ঘিরে যাবতীয় আবেগ বিবেচনায় রেখেও বলছি, এটি মূলত একটি সরকার কেন্দ্রীক জোট। আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৭৭ সালের ২১ জুন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তারপর গঠিত হয় বামফ্রন্ট কমিটি, যেটির চেয়ারম্যান হন সিপিএম নেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত। ভোটের আগে বামফ্রন্ট ছিল নিছকই একটা বোঝাপড়া।
সেই জোট এতটাই সরকার ও নির্বাচন কেন্দ্রীক ছিল যে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকাকালেও ব্লক, মহকুমা স্তরে সেটির কমিটি তৈরি হয়নি। জেলা স্তরের কমিটির বিষয়ে সিপিএমকে রাজি করাতে শরিক নেতাদের কালঘাম ছোটাতে হয়েছিল। কারণ, শরিকদের শক্তিবৃদ্ধি তারা চায়নি।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা ঠিক উল্টো। সময়ের দাবি হল বৃহত্তর বাম ঐক্য এবং কংগ্রেস-সহ প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক দলগুলির উদার জোট এবং জনস্বার্থবাহী ইস্যুতে লাগাতার আন্দোলন। নরেন্দ্র মোদী ভোটে ধাক্কা খেয়েছেন। তিনি যে বিরোধী জোট, এমনকী এনডিএ’র শরিক দলকে ভাঙিয়ে ফের শক্তিশালী হয়ে বিভাজন রাজনীতি তীব্রতর করবেন না, তার গ্যারান্টি আছে কি? তিনি ফের ডানা ঝাঁপটাবেন।
সেই ঝাঁপটার মুখে টিকে থাকতে, তৃণমূলের দুর্নীতি, অপশাসনের মোকাবিলা করতে হলেও বামফ্রন্টের বৃত্ত বড় করা দরকার। বিহারে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন এবং সিপিএম ও সিপিআই ইন্ডি জোটে থাকতে পারলে বাংলায় নয় কেন? নিছক ভোটে আসন ভাগাভাগি নয়, কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীদের রাজনৈতিক জোটও সময়েরই দাবি। কেরলের ধাঁচে এ রাজ্যেও এলডিএফ অর্থাৎ বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট হলে ক্ষতি কী?
কেরলের এলডিএফে কংগ্রেস নেই বটে, তবে বামেদের সঙ্গে যে দক্ষিণপন্থী দলগুলি আছে সেগুলির সঙ্গে হাত শিবিরের রাজনীতির কোনও ফারাক নেই। আর এবারের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ইস্তাহার এবং প্রচার থেকে স্পষ্ট শতাব্দি প্রাচীন দলটি ক্রমে বাঁ দিক ঘেঁষে চলতে চাইছে। একথাও নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করা দরকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সংবিধান রক্ষার লড়াইয়ে রাহুল গান্ধী সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জাতীয় স্তরে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন।
এমন হতে পারে বাম-অবাম নতুন দলগুলির বামফ্রন্টের বকলমে কার্যত সিপিএমের ছাতার তলায় মাথা গুজতে আপত্তি থাকতে পারে। কংগ্রেস দশ বছর ইউপিএ’র শরিকদের নিয়ে সরকার চালাতেও বিজেপি বিরোধী মঞ্চকে আরও বড় ও উন্মুক্ত করতে ‘ইন্ডিয়া’ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল, যেখানে শিবসেনার মতো দীর্ঘদিন বিজেপির সঙ্গে থাকা দল যোগ দিয়েছে। এই জোটকে ইউপিএ সরকারের দুর্নীতির দায় নিতে হয়নি। তাই বলে একশো দিনের কাজের প্রকল্প, শিক্ষা, খাদ্যের অধিকার আইনের ইউপিএ সরকারের কৃতিত্বগুলি কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়ে যায়নি। বাম-গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ-প্রগতিশীল বৃত্ত বড় করতে হলে বামফ্রন্ট’কে নিয়েও নতুন ভাবনাচিন্তা দরকার। সময়ের দাবি মেনে নতুন ফ্রন্ট গড়লেও বামফ্রন্টের অবদান তাতে বিলীন হয়ে যাবে না। যেমন ৫৭ বছর আগে সিপিএমের উদ্যোগে তৈরি দু-দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃতিত্ব মুছে যায়নি।