দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্থূলত্ব বা ওবেসিটির সঙ্গেও কি সম্পর্ক আছে করোনাভাইরাসের?
প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পেলেও গবেষক, ডাক্তাররা দাবি করছেন করোনা রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই ওবেসিটির শিকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে স্থূলত্ব এবং কোভিড সংক্রমণের মধ্যে যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা চলছে। ভারতের কোভিড রোগীদের উপর সমীক্ষা চালিয়ে প্রথম এমন দাবি করেছেন দিল্লির ডাক্তাররা।
দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এ ভর্তি কোভিড রোগীদের অর্ধেকই ওবেসিটিতে ভুগছেন, এমন দাবি করেছেন এইমসের এক সিনিয়র সার্জন ডাক্তার রশিদ গৌরি। তিনি বলেছেন, দশ জন কোভিড রোগীর মধ্যে পাঁচ থেকে ছ’জনই স্থূলত্বের শিকার। ডাক্তারের দাবি, ওবেসিটির সঙ্গে সরাসরি কোভিড সংক্রমণের যোগসূত্র আছে কিনা সেটা এখনও প্রমাণিত নয়। তবে মনে করা হচ্ছে স্থূলত্বের কারণে শরীরে এমনিতেই নানা রোগ দেখা দেয়, প্রতিরোধ ক্ষমতা তলানিতে এসে ঠেকে, তাকেই হাতিয়ার করছে করোনাভাইরাস।
একই দাবি, দিল্লির ধর্মশালা নারায়ণ সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের পালমোনোলজি কনসালট্যান্ট ডাক্তার নভনীত সুদেরও। তিনি বলেছেন, “কোভিড রোগীদের ৫০-৬০% ওবেসিটিতে ভুগছেন। এই রোগীদের হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। সাধারণত দেখা গেছে, মধ্যবয়স্ক কোভিড রোগীদের অর্ধেকই স্থূলত্বের শিকার। তাঁদের মধ্যে সঙ্কটাপন্ন রোগীদের বেশিরভাগেরই ফুসফুসের সমস্যা ছিল। তাই কোভিড সংক্রমণ খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়েছে।”
ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা কোভিড রোগীদের বেশিরভাগই স্থূলত্বের সমস্যায় ভুগছেন। ভাইরাস সংক্রমণের আগে থেকেই তাঁদের রোগ ছিল, বলেছেন গুরুগ্রামের মেদান্ত ফাউন্ডেশনের ডাক্তার সুশীলা কাটারিয়া। দিল্লিতে করোনা আক্রান্ত ইতালির পর্যটকদের সুস্থ করে তিনি খবরের শিরোনামে এসেছিলেন। ডাক্তার সুশীলা বলছেন, ওবেসিটির সঙ্গে কোভিডের যোগসূত্র খোঁজার গবেষণা ভারতে প্রথম হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি কোভিড রোগীদের উপর সমীক্ষা চালানো হচ্ছে। স্থূলত্ব কীভাবে ভাইরাসের সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত বা আদৌ কোনও যোগ রয়েছে কিনা, সেটা গবেষণার পরেই প্রমাণিত হবে।
করোনার সংক্রমণের সঙ্গে কীভাবে যোগ থাকতে পারে ওবেসিটির? ডাক্তাররা জানালেন সম্ভাব্য কারণ
ডাক্তারদের মতে, সব ভাইরাসেরই সংক্রমণ ছড়াবার একটা ধরন থাকে। সাধারণত দেখা যায়, শরীর যত দুর্বল হবে, শরীরে নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা যত কম থাকবে, সংক্রমণ সেখানেই বাসা বাঁধবে বেশি। আর সার্স-কভ-২ ভাইরাস তো সবার থেকে আলাদা। সাধারণ ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের থেকেও বহুগুণে বেশি সংক্রামক। এই ভাইরাসের বৈষিষ্ট্য হচ্ছে কোষের বাহক প্রোটিনের সঙ্গে মিলে গিয়ে (ACE 2) সরাসরি কোষে ঢুকে সংখ্যায় বাড়তে থাকা। এখন দেখা গেছে শরীরে যে অঙ্গের কোষেই এই প্রোটিন থাকবে সেখানে গিয়েই জুড়ে বসবে এই আরএনএ ভাইরাস। সেটা হতে পারে ফুসফুস, বা হৃদপেশী, অথবা লিভার, কিডনি, খাদ্যনালী। গবেষকরা বলছেন, এখন আর শুধু ফুসফুসেই সংক্রমণের গণ্ডি বেঁধে রাখেনি ভাইরাস। সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার কৌশল সে শিখে গেছে। তাই এই ভাইরাসের সংক্রমণের উপসর্গও বদলাচ্ছে। শুধু শ্বাসকষ্ট, জ্বর বা শুকনো কাশি নয়, আচমকা হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেলিওর, লিভারের সংক্রমণ বা খাদ্যনালীর সংক্রমণ ধরা পড়ছে রোগীর। এমনকি ত্বকেও বদল আসছে অনেক।
ডাক্তাররা বলছেন, স্থূলত্বের কারণে শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধে। হার্টের ক্ষমতা কমে, ফুসফুসের কার্যকারীতা কমে। ফ্যাটি লিভার, লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন অনেক রোগীই। অধিক স্থূলত্ব থেকে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, লিভার, খাদ্যনালীর রোগ এমনকি হরমোন ক্ষরণেরও তারতম্য দেখা দেয়। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই কম থাকে। তাই ভাইরাস এমন শরীরের সংস্পর্শে এলে তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। ওবেসিটিতে ভোগা রোগীর শরীরের কোষে ঢুকতে পারলেই কেল্লাফতে। নানা অঙ্গ এমনিতেই দুর্বল, পেশীর প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম, কাজেই ভাইরাল স্ট্রেনের বাড়বাড়ন্ত হতে বেশি সময় লাগে না। তবে এইসবই প্রাথমিকভাবে মনে করছেন ডাক্তাররা। কোভিড রোগীদের উপর পরীক্ষা চালিয়ে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
দিল্লির শ্রী বালাজি অ্যাকশন মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের ডাক্তার অনিমেষ আচার্য বলছেন, স্থূলত্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। আর সার্স-কভ-২ ভাইরাস শরীরে রোগ প্রতিরোধকেই আগে ভাঙার চেষ্টা করে। ওবেসিটিতে ভোগা রোগীদের বেশিরভাগেরই শ্বাসের সমস্যা থাকে। তাই সংক্রমণ একবার ধরে গেলে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ওবেসিটি ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলেই জানিয়েছেন তিনি। ডাক্তার অনিমেষ বলেছেন, আজকাল কম বয়সীদের মধ্যে স্থূলত্ব বেশি দেখা দেয়। জাঙ্ক ফুড, পুষ্টিকর ডায়েটের অভাব, লাইফস্টাইলে অনিয়ম নানা কারণে ওবেসিটিতে ভুগছে দেশের তরুণ প্রজন্মও। কাজেই সেদিন থেকে কোভিড সংক্রমণের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সতর্কতা অনেক বেশি প্রয়োজন।
স্থূলত্বের সঙ্গে কোভিড যোগ খোঁজার চেষ্টা আমেরিকা ও ব্রিটেনেও
ফ্রান্স, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা বলেছিলেন, ওবেসিটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষ যোগ থাকতে পারে কোভিড সংক্রমণের। নিউ ইয়র্কের নানা হাসপাতালে ভর্তি এমন চার হাজার কোভিড রোগীকে চিহ্নিত করা হয়েছে যাঁরা ওবেসিটির শিকার। তাঁদের মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন।
ফ্রান্সের একটি গবেষণা বলছে, দেশে কোভিড রোগীদের অনেকেই স্থূলত্বের সমস্যায় ভুগছেন। চিন্তার কারণ হল, এই রোগীদের বেশিরভাগই কম বয়সী।
মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এই ওবেসিটি বা স্থূলত্বকেও কোভিড সংক্রমণের ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ বলে উল্লেখ করেছে।