
শেষ আপডেট: 12 November 2023 17:17
শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের ভূমি নবদ্বীপ। জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান। তবে সুপ্রাচীন কাল থেকে সেই ভূমিতে শাক্ত সাধনাও চলত পাশাপাশি। কিন্তু দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালা বিভূষিতাম- সেই দেবীর অবস্থান সাধারণ ঘরোয়া মানুষগুলির থেকে যেন অনেক দূরে। সেই দেবীকে ভয় পাওয়া যায়, দূর থেকে শ্রদ্ধাও করা যায়, কিন্তু কোনওভাবেই যেন ভক্তির আবেশে মা ডাকা যায় না।
ইতিহাস বলে, দেবী কালিকার প্রতি মানুষের এই ভয়মিশ্রিত দূরত্ব রক্ষারই ফায়দা নিত নবদ্বীপের একশ্রেণির কাপালিক। শ্রীচৈতন্য পূর্ববর্তী-সমসাময়িক বা পরবর্তীতেও কাপালিটোলাগুলির কর্মকাণ্ড ছিল সাধারণ মানুষের কাছে বিভীষিকাময়। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের লড়াইটা শুরু এখান থেকেই। তন্ত্র অনুসারে দেবী কালিকা দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী। ভগবান শিবের তৃতীয় নয়ন থেকে তাঁর সৃষ্টি দুষ্টের দমনের জন্য। দুর্গা বা পার্বতীর একটি রূপ তিনি। তাঁকে ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠারই ব্রত নিয়েছিলেন কৃষ্ণানন্দ।
সপ্তদশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকে পিতা মহেশ্বর গৌরাচার্যের ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন কৃষ্ণানন্দ। ঐতিহাসিকদের মতে, সালটা ১৬০০ থেকে ১৬১০। বাবা কৃষ্ণভক্ত হলেও কৃষ্ণানন্দের আরাধ্যা ছিলেন দেবী কালিকা। সাধারণের বুদ্ধি-বিচারের বাইরে নয়, বরং সাংসারিক ঘেরাটোপের মধ্যেই দেবীকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কাজটা সহজ ছিল না আদপেই। কিন্তু হেরে যাননি। দেবীর করাল বদনাং রূপ নিয়ে কাপালিকদের জমিয়ে বসা ব্যবসায় আঘাত হানার কাজে সিদ্ধি এসেছিল অনেক চেষ্টার পর। তবেই না ভয়াল দেবী থেকে আদরণীয়া মায়ে এই রূপান্তর!
একদিকে তন্ত্রসার পুঁথি রচনার কাজ চলছে পূর্ণদ্যোমে। সেখানে শাক্ত-বৈষ্ণব-শৈব-গণপত্য সম্প্রদায়ের তন্ত্রগ্রন্থগুলি থেকে সার সংগ্রহের ব্যস্ততা, অন্যদিকে নবদ্বীপের সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিসহ করে তোলা কাপালিটোলাগুলির বিরুদ্ধে লড়াই। কিন্তু তার থেকেও বেশি যা উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল সাধক কৃষ্ণানন্দকে, তা হল ঘরে ঘরে তিনি তো প্রতিষ্ঠা করতে চান কালীকে। কিন্তু রূপের খোঁজ যে মিলছে না। মা যে ভয়াল নন, বরং মাতৃ স্বরূপিণী মহামায়া, তাতো চেনাতে হবে!
রাতের পর রাত কাটে পঞ্চমুণ্ডির আসনে। ধ্যান ভাঙে ভোরে। কিন্তু প্রাণের আরাম হয় কই! আবার অস্থিরতা গ্রাস করে। স্নান-আহার-দৈনিক পুজোপাঠ-শাস্ত্র আলোচনা কিছুতেই যেন মন লাগে না। চিত্ত দহনে ক্ষয় হয় শরীর। দেবীই তাঁকে রূপের সন্ধান দিক। ঝরে পড়ে সাধকের আকুতি। দিনের পর দিন কাটে। চিন্তিত হয়ে পড়েন তাঁর কাছের মানুষরা।
সে ছিল এক কৃষ্ণা চতুর্দশীর রাত। ঘোর অমানিশায় ঘিরেছে চরাচর। ধ্যানের ফাঁকেই মাটির তাল নিয়ে তাঁকে মূর্তি গড়তে দেখেন কৃষ্ণানন্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা তাঁর কয়েকজন শিষ্য। মাথা-মুখ-শরীর, যে অবয়ব ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে তা যেন বড়ই চেনা ঘরের মেয়েটি। গোটা সৃষ্টিপর্ব যেন তাঁর সাধনারই অঙ্গ। আগাগোড়া ধ্যানমগ্ন তিনি।
কীভাবে কৃষ্ণানন্দ পেয়েছিলেন তাঁর দেবীর সাকার রূপ, তা নিয়ে ঘরে ঘরে নানা গল্প। প্রচলিত, রূপের খোঁজে মায়ের কাছে রাতভর আকুতির পর ভোর হতে নিয়ম মেনে গঙ্গাস্নানে যাচ্ছিলেন তিনি। অন্ত্যজ পল্লীতেও তখন দিন শুরুর ব্যস্ততা। ঘরে বধূ এক কিশোরী তখন ঘুটে দিচ্ছে দেওয়ালে। গাত্রবর্ণ ঘোর কৃষ্ণ। কোমর উপচে কেশরাজি। অসংলগ্ন পরনের বসন। আচমকা সে পথে কৃষ্ণানন্দকে দেখে ত্রস্ত। লজ্জায় সে জিভ কাটতেই কৃষ্ণানন্দের সারা শরীরে শিহরণ। অবশেষে দেবীর কৃপা ভোরের বাতাস হয়ে এল। মানসপটে আঁকা এই ছবিকে গঙ্গামাটিতে রূপ দিলেন তিনি। বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হল মাতৃরূপে দেবী কালীর আরাধনা।