
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 13 September 2024 08:28
বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুনিয়র ডাক্তারদের বৈঠকের সম্ভাবনা স্রেফ একটি বিষয়ে জেদাজেদির কারণে ভেস্তে গেল। তা হল বৈঠকের লাইভ স্ট্রিমিং। এ ঘটনার পর অনেকেরই যেমন মনে হয়েছে, ডাক্তাররা অহেতুক জেদ ধরলেন। তেমনই নবান্নের উদ্দেশে এ প্রশ্নও উঠছে, লাইভ স্ট্রিমিং করলে কী ক্ষতি হত? সরকারের কীসের ভয়?
এই সব জিজ্ঞাসু ও কৌতূহলী মনকে খাটো করার কোনও উদ্দেশ্য আমার নেই। কারণ, এই কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা অতিশয় স্বাভাবিক। তাই তাঁদের মর্যাদা দিয়েই বলছি, সরকার চালানো একটা সিরিয়াস বিজনেস। এটা পাড়ার কোনও ক্লাব চালানোর মতো অ্যামেচার বা শখের ব্যাপার নয়। সরকার একটা নিরন্তর বিষয়। তাকে ভাবতে হয় আজ যে প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম, তা আগামী দিনে কোনও সমস্যা তৈরি করবে কিনা। তা সে ভবিষ্যতে যে দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন!
আরেকটু সহজ করে বোঝাতে গিয়ে তিনটি কাল্পনিক পরিস্থিতির উদাহরণ দিতে চাই। ধরা যাক, সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক চাষীরা বলছেন, তাঁরা জাতীয় সড়ক থেকে তখনই উঠবেন যদি মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন এবং তা যেন লাইভ স্ট্রিমিং করা হয়। বুদ্ধদেববাবু কি রাজি হতেন? আমার বিশ্বাস প্রশাসক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কখনও রাজি হতেন না। এবং তা করে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিতেন।
লোকপাল বিলের দাবিতে দিল্লিতে যখন আন্না হাজারে অনশনে বসেছিলেন তখন অচলাবস্থা কাটাতে তাঁর সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। সেই সময়ে যদি প্রস্তাব দেওয়া হত যে এই বৈঠক লাইভ স্ট্রিম করতে হবে, প্রণববাবুও কি রাজি হতেন। ব্যক্তিগত ভাবে প্রণববাবুকে আমি যতদূর চিনি, তিনি এই বালখিল্য দাবি কখনওই মানতেন না। বরং প্রশাসনিক বিষয়ে অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিলেন তিনি।
রাজধানী দিল্লিতে সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল কৃষকদের আন্দোলন। টানা দেড় মাস ধরে অচলাবস্থা তৈরি করে রেখেছিলেন তাঁরা। কৃষকরা যদি দাবি করতেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেই বৈঠক করব এবং তা লাইভ করতে হবে, মোদী-অমিত শাহ কি তা মেনে নিতেন? আমি মনে করি, অমিত মালব্য এখন যাই টুইট করুন না কেন, মোদী-শাহ তা মানতেন না।
মানতেন না এই কারণেই যে এটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কথায় কথায় লাইভ স্ট্রিমিংয়ের দাবি উঠবে। এর পর জেলায় চুরি, ডাকাতির মতো ঘটনা নিয়ে জেলা শাসকের কাছে ডেপুটেশন দিতে গেলেও লোকে বলতে পারে, লাইভ স্ট্রিমিং করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী লাইভ স্ট্রিম করছেন, আপনি মশাই কোন ছাড়!
দ্বিতীয় বিষয়, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের জন্য ৩২ জন জুনিয়র ডাক্তার নবান্নে গিয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই উচ্চ শিক্ষিত। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা খুবই সঙ্গত কিছু কথা বলবেন সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু এও মনে রাখতে হবে যে, আরজি কর হাসপাতালে যে পাশবিক ঘটনা ঘটেছে তাতে এঁদের সবার মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। তাঁদের বয়স কম। আন্দোলন করে দিন বদলের রোমান্টিকতা রয়েছে ভরপুর। সেই উত্তেজনায় লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মধ্যে কেউ যদি এমন কিছু কথা বলে দিতেন যে মুখ্যমন্ত্রীর আসনের পক্ষে অবমাননাকর বা অসম্মানজনক, তা কি খুব ভাল হত। চেয়ারে কে বসে রয়েছে ভুলে যান। আসনটা মুখ্যমন্ত্রীর। সুতরাং কোনও সরকার কি এই ঝুঁকি নিতে চাইবে? মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ কি সেই আশঙ্কার কথা ভাববেন না? মুখ্যমন্ত্রীর আসনের যাতে মর্যাদা থাকে সেই দায়িত্ব তাঁরও।
তৃতীয় বিষয় হল, সরকার প্রস্তাব দিয়েছিল খোলামনে আলোচনা হবে। অর্থাৎ জুনিয়র ডাক্তারদের যে দাবিদাওয়া বা ক্ষোভ অসন্তোষ রয়েছে তা তাঁরা খোলাখুলি জানাতে পারেন। আরজি করের ঘটনায় সুবিচার ও ডাক্তারদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ব্যাপারে সরকার যথাসম্ভব দাবি মানারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। তা ছাড়া এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টও যারপরনাই চাপে রেখেছে রাজ্য সরকারকে। এহেন পরিস্থিতিতে যখন আলোচনা হয় তখন সরকারের নেতারা ঘরোয়া ভাবে অনেক সময়েই বোঝানোর চেষ্টা করেন। এবং জট ছাড়ানোর চেষ্টা করেন। লাইভ স্ট্রিমিং হলে বৈঠকের সেই সহজ গতি ও পরিবেশ রাখা সম্ভব নয়। তখন প্রতিটা কথা মেপে বলতে হবে। সেই বৈঠক তখন আড়ষ্ট হতে বাধ্য।
সর্বোপরি আরজি কর হাসপাতালে যে পাশবিক ঘটনা ঘটেছে তাতে গোটা বাংলার মানুষের দুঃখ, যন্ত্রণা ও ক্ষোভ রয়েছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর। ফলে সরকারের দিক থেকে প্রতিটি কথার উপর মানুষ নজর রাখছে। কিছু মাত্র এদিক ওদিক হলে মানুষ রাগ উগরে দিচ্ছে। যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ফোঁস’ করার কথা বলায়, বহু মানুষ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। পরে মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে হয়েছে, আমার কথার অপব্যাখ্যা হয়েছে।
এই অবস্খায় জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠক লাইভ স্ট্রিমিং করার সাহস দেখানোও বোকামি। কারণ, তাতে সরকার বা শাসক দল সম্পর্কে মানুষের আরও কতটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হল তার চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক হল আর অস্থিরতা কাম্য নয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে যে স্থবির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা শুধরোনো সময়ের দাবি। পরিস্থিতি নতুন করে বিগড়ে গেলে তা কারও জন্যই ভাল হবে না।
চুম্বকে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের দাবি, একটা লঘুতর বিষয়। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে জুনিয়র ডাক্তাররা সরকারের সঙ্গে সহমত না হলে বা সরকারের কোনও কথা তাঁদের খারাপ লাগলে বাইরে বেরিয়ে এসে বলতেই পারেন। কারণ, মানুষ তাঁদের কথা শুনছে। তাঁদের বিশ্বাস করছে। তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তাঁদের জন্য বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছে। সরকারও যে তাঁদের আস্থা অর্জনে কাতর। তাও কি তাঁরা বুঝছেন না! এর পর আর কি লাইভ স্ট্রিমিংয়ের সত্যিই দরকার আছে?