
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 21 March 2025 14:26
পেশায় ইন্দো-আমেরিকান সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন দ্বৈপায়ন। দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। ‘ছিলেন’ বলতে হচ্ছে। কারণ, গতকাল নিউ টাউনের একটি বহুতলের সাত তলা থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর।
গত বছর, ফেব্রুয়ারি মাসে ফেসবুকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউড ছবি ‘টুয়েলভথ ফেলে'র একটি রিভিউ লিখছিলেন দ্বৈপায়ন। ঝরঝরে, মেদবর্জিত বয়ানে—বিধু বিনোদ চোপড়ার ছবির মতোই ঠাসবুনট। সেখানে চলচ্চিত্রটির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘সরল ও সৎ হওয়ার গুরুত্ব কতটা, এই ফিল্ম আমাদের সেই শিক্ষাই দিয়ে যায়। জীবনে বাধা পেয়ে থাকলে, কাউকে ভালবেসে থাকলে আর কঠোর পরিশ্রমে আস্থা রাখতে চাইলে এই ছবি তোমার জন্য।’ দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে, জীবনের কানাগলিতে পথ হারালে ‘রিস্টার্ট’ করো—‘টুয়েলভথ ফেল’ সেই বার্তাই ছুড়ে দিয়েছিল।
দ্বৈপায়ন ‘রিস্টার্ট’ করতে পারলেন না।
ঠিক কী কারণে মৃত্যু হল তাঁর, এই নিয়ে পুলিশ এখনও ধোঁয়াশায় রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, অবসাদ থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন দ্বৈপায়ন। সহকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন নাকি তাঁকে বেশ ‘বিমর্ষ’ দেখাচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন তিনি, নিচ্ছিলেন মনোবিদদের পরামর্শ, খাচ্ছিলেন ওষুধ—এই সমস্ত তথ্যও সামনে এসেছে। তারপর আচমকা এক দুপুরে অফিস চলাকালীন কম্পিউটার বন্ধ করে, হাতের কাজ মুলতবি রেখেই, খুব সম্ভবত, বহুতল থেকে নীচে ঝাঁপ দেন তিনি৷ প্রথমে আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান সহকর্মীরা। সেখানে আইসিইউতে রাখা হয়৷ সন্ধ্যার পর মৃত্যুর খবর সামনে আসে।
একটা মৃত্যু। যার ‘কারণ’, ‘সম্ভাব্য কারণ’ প্রথমে জানাজানি হয়। তারপর চর্চা চলে। শেষে সবকিছু বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। ‘অবসাদে আত্মহত্যা’ নতুন কোনও বিষয় নয়৷ আইটি কর্মীর আত্মহননও বেশ চর্চিত একটি ‘টপিক’। তবু কেন নিজেদের প্রাণ কেড়ে নেয় কেউ? প্রতিভার কমতি নেই কিংবা তার কদর জোটেনি—এমন নয়। শিক্ষাগত, পেশাগত বিশ্বে অমিত সাফল্য অর্জন করেছিলেন দ্বৈপায়ন৷ ছিল সাজানো সংসার। ফলপ্রসূ ক্লায়েন্ট মিটিং৷ দশটা-পাঁচটার অফিস। আকছার বিদেশ সফর। পরিবারের সঙ্গে ডিনারে যাওয়া। তা সত্ত্বেও রোদে-ভরা দুপুরে, চলন্ত শহরের বুকে, এক জেগে থাকা কর্মপ্রতিষ্ঠানের সাত তলা থেকে, যদি তদন্তের প্রাথমিক অনুমান সত্যি হয়, তাহলে ‘ঝাঁপ’ দিতে হল কেন দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে?
এর কারণ খুঁজতেই ‘দ্য ওয়ালে’র তরফে যোগাযোগ করা হয়েছিল মনোবিদ সাহানা নাগের সঙ্গে। সরাসরি রাখা হয় প্রশ্ন: একজন মানুষ, যে কাজের জগতেই থাকুন না কেন, তিনি কীভাবে বুঝতে পারবেন ভাল আছেন নাকি খারাপ? খারাপ থাকলে কতটা খারাপ?
জবাবে মনোবিদ বলেন, ‘ইদানীং আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি: বিভিন্ন ধরনের মুড ডিসঅর্ডার, যেমন: বাইপোলার ১, বাইপোলার ২ কিংবা ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের বিভিন্ন ধরন, তার সঙ্গে সুইসাইড রিস্কের একটা সংযোগ রয়ে যাচ্ছে৷ বিশেষ করে বাইপোলার ২-র ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, সেই মানুষটির রোজকার জীবন ও কাজের ধরনের দিকে। তা কি আগের চাইতে বদলে গিয়েছে? যে ধরনের কাজে তিনি আনন্দ পেতেন, তাঁর করতে ভাল লাগত, সেই কাজগুলো কি এখনও একইরকম আনন্দ দিচ্ছে? ব্যস্ততা গুরুত্বপূর্ণ নয়। লক্ষ্য রাখতে হবে, জীবনের জটিলতার জন্য যে পছন্দের বিষয়গুলি তিনি উদযাপন করতে পারতেন না বলে খেদ প্রকাশ করতেন, সেই খেদ কি এখনও একইরকম রয়ে গিয়েছে? এই পজিটিভ ফ্যান্টাসি প্রকাশ করাটা যদি আগের চেয়ে কমে যায়, তাহলে আমাদের খোঁজ নিতে হয়৷ সে খোঁজ মনের খোঁজ।’
পজিটিভ ফ্যান্টাসি কিংবা ইতিবাচক আনন্দ বোঝানোর প্রবণতা কতখানি কমে গেলে সতর্ক হতে হবে? দু:খবোধ কতটা গভীর হলে বিষয়টি অ্যালার্মিং হতে পারে? মনোবিদের ব্যাখ্যা: যখনই কেউ বলবেন ‘আর থাকতে ইচ্ছে করছে না’ কিংবা ‘অনেক দূরে চলে গেলে ভাল হত’—তখন তাকে স্রেফ ‘মুখের কথা’ হিসেবে না ধরে ‘আঁতের কথা’ হিসেবে ধরতে হবে। ছুড়ে দিতে হবে প্রশ্ন: ‘অনেক দূর’ বলতে তিনি কী বোঝাতে চাইছেন? উত্তরটা জরুরি। পেলে ভাল। না পেলে তাঁকে নিয়ে যেতে হবে সাইক্রিয়াটিস্ট কিংবা কাউন্সিলারের কাছে৷ তিনি ধাপে ধাপে বিজ্ঞানসম্মত প্রশ্ন করে বুঝতে পারবেন ভয়ের সম্ভাবনা (রিস্ক ফ্যাক্টর) ঠিক কতটা? তারপর প্রয়োজনে থেরাপি চালু করবেন৷ যদি ডিপ্রেশন হয় তাহলে শুরুতেই থেরাপিতে কাজ হবে না। ওষুধ চালু করতে হবে। তারপর কাজে আসবে সাইকোথেরাপি।
এক্ষেত্রে আশপাশের মানুষ, তিনি হতে পারেন সহকর্মী, সহপাঠী কিংবা পরিবার-পরিজন, তাঁদের ভূমিকা হবে পরিদর্শক কিংবা শ্রোতার। মানুষটাকে কি আগের চাইতে প্রাণোজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছ্বল লাগছে? পজিটিভ ফ্যান্টাসি বেড়েছি কিছুটা? তিনি কি কাজের বাইরের উদ্বৃত্ত সময়ে সৃষ্টিশীল কিছু করা নিয়ে উৎসাহী? তাহলে বুঝতে হবে থেরাপিতে, চিকিৎসায় কাজ হচ্ছে।
সাহানাদেবীর মতে, আত্মহত্যার আগে প্রায় সকলেই একটা সংকেত দিয়ে যান। আর সেই সংকেত ধরা থাকে মুখের কথায়। নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তির কথা একবার না একবার বলে যান তাঁরা। তখন বিষয়টি ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ‘ও কিছু হবে না, এগুলো তেমন কিছু নয়’—বলাটা ডেকে আনতে পারে বিপদ৷
দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য গতকাল দুপুরের আগে, সম্ভবত, বিপদের অ্যালার্ম বেল বাজিয়ে গেছিলেন। মুহুর্মুহু।
আত্মহননের সেই ঘণ্টাধ্বনি শোনার লোক ছিল কি?