
'কালোদিঘি'র লেখক উজ্জ্বল সিনহা
শেষ আপডেট: 31 January 2025 12:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পেশায় উদ্যোগপতি, নেশায় লেখক উজ্জ্বল সিনহার কর্পোরেট কেরিয়ার যতখানি অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, লেখকজীবন কালের নিক্তিতে ততখানি বিস্তৃত নয়। কিন্তু জীবনের পর্ব থেকে পর্বান্তরে জমতে থাকা ছবিমালার নির্বাচিত কিছু দৃশ্যপট বেছে উপন্যাস লেখেন যিনি, তাঁর রচনার বিষয়কুশলতা ও প্রয়োগনৈপুণ্য দেখে বিশ্বাস করতে অসুবিধে হয়, ‘কালোদিঘি’ নামক উপন্যাসোপম রচনাটি তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ!
গতকাল কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার প্রেস কর্নারে বইয়ের প্রচ্ছদ উন্মোচনের অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের বক্তব্যে এই বিস্ময়ই ঘুরেফিরে আসছিল। যেখানে উপস্থিত ছিলেন কবি শ্রীজাত থেকে নাট্যকার তথা রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। সাহিত্যিক অমর মিত্র থেকে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। আর অনুষ্ঠানের মধ্যমণি গ্রন্থের ভূমিকা-লেখক, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শ্রীজাত উপন্যাসের গঠন ও আঙ্গিকের ভূয়সী প্রশংসা করেন। গল্প জুড়ে জুড়ে উপন্যাস গ্রথিত। অথচ কোথাও ছন্দপতন নেই। পাশাপাশি কুর্নিশ জানান লেখক উজ্জ্বল সিনহার আন্তরিক প্রণোদনাকেও—‘বইয়ের পাতা উলটে আমি যেটুকু বুঝেছি, লেখক কখনও পাঠকের কথা ভেবে কলম তুলে নেননি। উনি নিজেকে আনন্দ দিতে লিখেছেন৷ এটা খুব জরুরি৷ তার কারণ শুধুমাত্র পাঠকের কথা চিন্তা করলে রচনা প্রভাবিত হয়। নিজেকে তৃপ্তি দিতে কলম ধরলে লেখাই পুরস্কার হয়ে ধরা দেয়।’
আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে তুলে ধরেন, কীভাবে বিশ্বায়ন-উত্তর পৃথিবীতে মানুষের বাস্তবতার ধারণা গুলিয়ে যাচ্ছে। সংক্রামিত হচ্ছে পরাবাস্তবতা। ‘কালোদিঘি'-ও এই বাস্তব আর পরাবাস্তবতার সার্থক সেতুবন্ধন। ‘একরৈখিক গল্পকথন ছেড়ে সূত্রাকারে একাধিক গল্পকে জুড়ে দিয়েছেন লেখক। কঠিন বাস্তব ও রহস্যের ইন্দ্রজাল মিলেমিশে গেছে।’—মত আলাপনের।
‘হিজল কাঠের আসবাব’, ‘অভিসার’, ‘লাইব্রেরি চেয়ার’—এমন সাতটি গল্পকে বিন্যস্ত করেছেন লেখক উজ্জ্বল সিনহা। আপাতদৃষ্টিতে প্রতিটিই স্বতন্ত্র রচনা বলে মনে হলেও একটা প্রচ্ছন্ন ধরতাই কিন্তু রয়ে গেছে। সেই সুতোটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব পাঠকের। সেদিক দিয়ে আয়াসহীন নয় এই পাঠ, মত শীর্ষেন্দুর—‘উপন্যাসের ভাষা অনাবিল। কিন্তু গঠন সরল নয়। একে সুখপাঠ্য রচনা বলা যায় না। রস আস্বাদনের জন্য পাঠককে পরিশ্রম করে যেতে হবে। যে সুতো দিয়ে কাহিনি বোনা হয়েছে, তা খুঁজে বের করার দায় পাঠকের। গল্প জুড়ে জুড়ে উপন্যাস লেখার প্রবণতা অভিনব না হলেও এখনও পর্যন্ত অপরীক্ষিত। ‘কালোদিঘি’ সেদিক দিয়ে আঙ্গিকের নিরীক্ষা হিসেবে বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।’
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ভূমিকা প্রবন্ধে ‘কালোদিঘি'তে ম্যাজিক রিয়ালিজমের উল্লেখ করেছেন—‘উজ্জ্বল সিংহ এই উপন্যাসে জাদু বাস্তবতাকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছেন তাঁর নিজের মতো করে।’ ব্রাত্য বসু যদিও সেখান থেকে কিছুটা সরে আসতে চান। জানিয়েছেন উপন্যাসের চালিকাশক্তি হিসেবে তিনটি বিষয়ের কথা—আমাদের হেরে যাওয়া, সময়ের প্রতি ব্যঙ্গ এবং বিষাদ। লেখকের নস্টালজিয়া এনেছে ‘বিষাদখিন্নতা’। আর তাঁর পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে সময় নিয়ে তির্যক মন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে, মত ব্রাত্যের। প্রসঙ্গত, ‘অনুষ্টুপ’ সহ একাধিক শারদীয়া পত্রিকায় ছোটোগল্পের যে সিরিজ প্রকাশিত হয়, তাকেই এখানে উপন্যাসের চেহারা দেওয়া হয়েছে।
জাদুবাস্তবতার কথা সকলে বলছেন ঠিকই। কিন্তু তাকে কি ‘রূপকথার বিনির্মাণ’ হিসেবেও দেখা যেতে পারে? প্রশ্ন তুলেছেন সাহিত্যিক অমর মিত্র। প্রথম পরিচ্ছেদের নাম ‘হিজল কাঠের আসবাব’। কাঠের কারবারি রাখাল সর্দার ও সম্পন্ন গৃহস্থ হরিপদবাবুকে নিয়ে গল্প। সমান্তরাল নাতিদীর্ঘ কাহিনি; আপাতসংযোগবিহীন। হরিপদবাবু মৃত্যুর পর হিজল গাছ হয়ে পুনর্জন্ম নেন। আর রাখাল সর্দার কাঠগোলায় কাঠ হয়ে ফিরে আসে। আবার ওই কাঠেরই বানানো আসবাব হিসেবে নিজের সংসারে ফের পা রাখেন হরিপদবাবু। আখ্যানের এই চলন আমাদের অতিপরিচিত রূপকথার কথা মনে করায়। অভিমত অমরবাবুর।
সকলের বক্তব্যশেষে বলতে উঠে লেখক উজ্জ্বল সিনহা জানান, কীভাবে মনে জমে থাকা পলি থেকে নির্দিষ্ট কিছু ছবিকে বেছে নিয়ে এই উপন্যাস লিখে ফেলেছেন। তথ্যের কারবারি নন; বরং অনুভূতিমালার প্রকৃত ছবিয়াল হিসেবেই নিজেকে দেখতে ও দেখাতে চান তিনি। আর এই ছবিই বিম্বিত হয়েছে গ্রন্থের প্রচ্ছদে৷ মানসিক জটিলতার পাশাপাশি উপন্যাসের স্পিরিটটিও ‘কালোদিঘি’র মোড়কে প্রকাশ পেয়েছে। গতকাল বইমেলার প্রাঙ্গণে পাঠকের দরবারে তা উন্মোচিত হল।