দ্য ওয়ালের আয়োজিত শারদ শ্রেষ্ঠ (The Wall Sharod Shrestho 2025) সম্মানে কলকাতার সেরা ক্লাব ও আবাসনের দুর্গাপুজো বেছে নেওয়া হলো। ঢাক, থিম আর তারকাদের উপস্থিতিতে শহর ভাসল উল্লাসে।

দ্য ওয়াল শারদ শ্রেষ্ঠর বিচারক অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য এবং ঋতাভরী চক্রবর্তী।
শেষ আপডেট: 29 September 2025 15:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুর্গাপুজো— এই শব্দটা কেবলই এক উৎসবের নাম নয় (Durgapuja)। এর সঙ্গে যেন জুড়ে আছে বাঙালিক আত্মার টান, আত্মপরিচয়। এই পরিচয়ের প্রতিটা পরতে মিশে আছে ঢাকের বাদ্যি, আলোর ঝলকানি, ফুলের গন্ধ আর ভোগের সুবাস। এই সবের সঙ্গেই তালে তাল মিলিয়ে ছুটছে প্রজন্ম। প্যান্ডেল হপিং, ডাইন আউটের মাঝেই সেরে নিচ্ছে নিষ্ঠাভরে অঞ্জলির পর্ব। নেচে নিচ্ছে ধুনুচি হাতে।
এবার সেই প্রাণের উৎসবেই শামিল হয়েছিল 'দ্য ওয়াল'। 'কেওকার্পিন প্রেজেন্টস দ্য ওয়াল শারদ শ্রেষ্ঠ ২০২৫' (The Wall Sharod Shrestho 2025) পুরস্কারের হাত ধরে স্বীকৃত ও সম্মানিত হল শহরের বেশ কিছু সেরা পুজো। ক্লাব থেকে আবাসন— সব মিলিয়ে একশোটি ক্লাব আর পঞ্চাশটি আবাসনের পুজোকে চোখের সামনে এনে বেছে নেওয়া হয়েছিল সেরা। সেই সেরার ফলস্বরূপ শুধু পুরস্কার নয়, মিলল পরিচয়, শ্রমের গল্প আর এক মঞ্চে উঠে এল সমাজের নানা রঙ। টানটান লড়াই, উনিশ-কুড়ির ফারাকে বেছে নেওয়া হল সেরা পুজোগুলিকে।
প্রতিযোগিতার পিছনে প্রস্তুতির কাজটা ছিল যথেষ্ট কঠিন। প্রথম ধাপে সরকারি আর্ট কলেজের বিশেষজ্ঞ শিল্পীদল প্রতিটি পুজো খুঁটিয়ে দেখে। থিম, সেট-ডিজাইন, প্রতিমা, পরিবেশ-সমন্বয়, দর্শক-অন্তর্ভুক্তি— সব দিক মেপে মোট দেড়শো পুজো শর্ট লিস্ট করে ফেলে তারা। এরপর চূড়ান্ত পর্বে বিচারক হিসেবে হাজির ছিলেন অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য, ঋতাভরী চক্রবর্তী ও ফিনান্স বিশেষজ্ঞ সুরজিৎ কালা। তাঁদের বিচারের শেষে, সেরা পুজোগুলোকে পুরস্কার তুলে দেওয়া হল। পুরস্কার দিলেন দ্য ওয়ালের এডিটর-ইন-চিফ শঙ্খদীপ দাস ও বিশেষ বিচারকরা।

দ্য ওয়ালের বিচারে সেরা পুজো হল, অর্জুনপুর আমরা সবাই ক্লাব। তারা প্রশংসা পেল কেবলই পুজোসজ্জার কারণে নয়, তারা পেয়েছে লোকজ আদি-আবেগ আর সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বতন্ত্র এক পুজো গড়ে তোলার জন্য। পুজোর হাওয়ায় হাওয়ায় যেন উচ্ছ্বাস ফেটে পড়ে এই প্রথম জয়ের আনন্দে।

উত্তরের শারদ শ্রেষ্ঠ সম্মান গেল নলিন সরকার স্ট্রিট সর্বজনীন দুর্গোৎসবে। দক্ষিণের সেরার মুকুট পড়ল বেহালা নূতন দলে। বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন পেয়েছে সেরা প্রতিমার খেতাব, যেখানে কুমোর-শৈলীর নিখুঁত শৈল্পিক ভারসাম্য আর জনগণিক আবেগকে একত্রে ধরে রাখে। আর কাশী বোস লেন দুর্গাপুজো সমিতি পেল সেরা পরিবেশ—তারা দেখিয়েছে কীভাবে শহরের ছোট পথটাকেও নিয়ে নেওয়া যায় এক পুজোৎসবের মঞ্চে।

তালিকায় নাম এসেছে আরও— চেতলা অগ্রণী, রাজডাঙা নব উদয় সংঘ, নিউ আলিপুর সুরুচি সংঘ, শ্রীভূমি স্পোর্টিং, বেলেঘাটা গান্ধী মাঠ ফ্রেন্ডস সার্কেল। সকলেই পেয়েছে সম্মান।
পাশাপাশি, আবাসনের বিভাগে উদিতা, ডায়মন্ড সিটি সাউথ ও শেরউড এস্টেট—তিনটি পুজো জায়গা করে নিয়েছে শহরের আবাসিক সংস্কৃতির পুজোর খোঁজে।
শারদ শ্রেষ্ঠ সম্মান পৌঁছে দেওয়ার ষষ্ঠীর সকালটা সেজে ওঠে হইহই করে। দ্য ওয়ালের টিম রাজডাঙার অফিস থেকে রওনা হয় মহা ধুমধামে। প্রথম গন্তব্য রাজডাঙা নব উদয় সংঘ। তাদের পুজোর থিম, ‘প্রশ্ন’। এই পুজো দর্শকদের ভাবাতে বাধ্য করে। এরপর পৌঁছোনো হয় অর্জুনপুর আমরা সবাই। তাদের থিম, ‘মুখোমুখি’। লোকজ আর সমসাময়িকতার এক মিলনমেলা। দ্য ওয়ালের টিম পৌঁছনো মাত্র ঢাকের তালে সেখানে মেতে ওঠেন সকলে। আওয়াজ ওঠে, ‘থ্রি চিয়ার্স ফর অর্জুনপুর, থ্রি চিয়ার্স ফর দ্য ওয়াল’। চিৎকার করে ওঠে সমগ্ৰ ভিড়, আর ঢাকের তালে নেচে ওঠে সবাই।
তারপর ছিল নলিন সরকার স্ট্রিট, যাদের থিম ‘রূপান্তর’। সেখানে শিল্পীরা বদলের কাহিনি বলেছে— কেন বদলায় মানুষ, বদলে যায় আচার, বদলে যায় দেবতার প্রতিকৃতি। ‘পাকদণ্ডী’ থিমে সেজে ওঠা কাশী বোস লেনেও উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলেঘাটা গান্ধী মাঠ ফ্রেন্ডস সার্কেলের থিম ‘শিরোনাম’। বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের থিম ‘প্রথা’। চেতলা অগ্রণীর 'অমৃত কুম্ভের সন্ধানে' সেজে ওঠে ইতিহাসের কাহিনিতে।
দ্য ওয়ালের বিচারক, অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য এসে ঢাকের তালে কোমর দুলিয়ে নেচে ওঠেন এই পুজোয়। সুরুচি সংঘের থিম ‘আহুতি’, তারা এই শব্দকে তুলেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে। শ্রীভূমি স্পোর্টিংয়ের থিম 'স্বামী নারায়ণ অক্ষরধাম টেম্পল অফ নিউ জার্সি'। সব শেষে পৌঁছনো হয় বেহালা নূতন দলে, তাদের থিম ‘শিবানী ধাম’।
ষষ্ঠীর বিকেলে বিচারকরা যখন বিভিন্ন মণ্ডপের মঞ্চে পৌঁছে পুরস্কার তুলে দিলেন, তখন গোটা শহর যেন আবেগে উদ্বেল। শারদ শ্রেষ্ঠর ট্রফি অর্জন করে ঝলমলিয়ে উঠল সেরাদের পরিশ্রম-ক্লান্ত মুখগুলি। বিজয়ীরা যে কেবল নিজেরাই উল্লসিত হলেন তাই নয়, সেই সঙ্গে দর্শক-দলও যেন পুরস্কৃত হল, কারণ পুজো তো তাদেরই প্রাণ!

দ্য ওয়ালের শারদ শ্রেষ্ঠ ও তাকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা যেন প্রমাণ করে দিল— দুর্গাপুজো এখন আর কেবলই একটা বাৎসরিক উৎসব নয়, এটি বহু মানুষের স্বপ্ন ও শ্রমের ফসল, সমাজের প্রতিবিম্ব এবং নতুন প্রতীক তৈরিরও জায়গা। দ্য ওয়ালের পুরস্কার তাদেরই সামনে এনেছে, যারা শহরের বদলে যাওয়ার স্পন্দনকে ধরে রেখেছে, চরাচরের গণ্ডি লঙ্ঘন করে, নতুনভাবে প্রশ্ন করেছে, স্বাতন্ত্র্যকে মঞ্চে তুলেছে।
এত সব ঝাড়াইবাছাই শেষে যারা পুরস্কার পেল, তারা কেবল ট্রফিটিই অর্জন করেনি, এ শহরের স্মৃতি, সংরক্ষণ, এবং এক জোরালো অনুপ্রেরণাও কণ্ঠ হয়ে উঠেছে। আগামী বছর আরও বড় দেখার আহ্বানও জানিয়েছে তারা।