
টিনটিনের কমিক্স
শেষ আপডেট: 15 January 2025 17:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিনকতক বাদেই বইমেলা। আর বইমেলা মানে যাই যাই শীতের রোদ গায়ে মেখে খুঁজে চলা নতুন বই… চেনামুখগুলোর পরিচিত হাসি, বন্ধু গার্গী-শ্রেয়সীর স্মৃতিরোমন্থনের ফাঁকে ‘বইমেলা ধুলো’ ঘেঁটে ব্যাগভর্তি বেস্টসেলার!
সেই লিস্টিতে কি রাখতে চান দুর্দান্ত, রোমহষর্ক অভিযান? অ্যামাজন থেকে তিব্বত, চন্দ্রলোক থেকে সমুদ্রতলদেশ… ঘুরে বেড়াতে চান অজানা, অচেনা দুনিয়া? নিজের শৈশব ফিরে পেতে কিংবা ছেলেমেয়ের আবদার রাখতে চাইলে ঝোলায় পুরতেই হবে টিনটিনের দু:সাহসী অ্যাডেভেঞ্চার কাহিনি।
আপনার কথা ভেবে দ্য ওয়াল বেছে দিল টিনটিনের সেরা পাঁচটি কমিক্স!
নামের মধ্যেই থ্রিলার থ্রিলার গন্ধ। প্লটের পুরোটা জুড়েও সত্যিকারের রোমাঞ্চ-শিহরণ! একটি পান্নার হারিয়ে যাওয়া নিয়ে গল্প। এই কমিক্সের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে এর ‘সেটিং’। কারণ, টিনটিনের একমাত্র এই কাহিনির পুরোটাই ঘরের অন্দরমহলে ঘটে। বাইরের দৃশ্যপট নেই বললেই চলে। ঘটনাস্থল: মার্লিনস্পাইক হল (ক্যাপ্টেন হ্যাডকের বাড়ি)।
গল্পে চরিত্রের ডিটেলিং নজরকাড়া। অপেরা গায়িকা বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়র (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অনুবাদে: ‘মিলানের কোকিলকণ্ঠী’) কাহিনির বাড়তি আকর্ষণ। পাশাপাশি প্রফেসর ক্যালকুলাস আমদানি করেছেন তাঁর ট্রেডমার্ক হাস্যরস। ক্যালকুলাস কানে খাটো। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্ন ঠিকভাবে শুনতে না পেয়ে এমন কিছু জবাব দেন এবং সেই জবাব চারদিকে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, ক্যাপ্টেন হ্যাডকের সঙ্গে মিলানের কোকিলকণ্ঠীর বিয়ে হবে—এহেন গুজবও একসময় সকলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এই টানাপোড়েন, হাসি-মজা-গুজব ও টানটান রহস্যের বুনন গল্পের পাতা ওল্টাতে বাধ্য করে।
টিনটিনের গল্পের মূল রস হচ্ছে বিস্ময়। বহু অজানা জগতের সন্ধান দিয়েছেন অ্যার্জে। কখনও চাঁদ, কখনও অ্যামাজনের গহিন জঙ্গল, কখনও বা বিপদসংকুল তিব্বতের তুষারধবল উপত্যকা। একইভাবে ‘লাল বোম্বেটের গুপ্তধনে’ এসেছে আন্ডারওয়াটারের অচেনা দুনিয়া। গল্পের সিংহভাগ অংশ সমুদ্রের তলদেশের অজানা বিশ্বকে তুলে ধরে। পাশাপাশি কমিক্সের সম্পদ এর ছবি। জাহাজের রেখাচিত্র এতটাই নিখুঁত যে, খুদে পাঠক গল্প পড়ামাত্র অ্যাডেভেঞ্চারে বেড়োনোর স্বপ্ন দেখে। শোনা যায়, অ্যার্জে দীর্ঘদিন বিভিন্ন বন্দরে গিয়ে চোখে দেখা জাহাজকে স্কেচের পাতায় রূপ দিয়েছিলেন যাতে ছবিগুলি আরও নিখুঁত ও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে৷ উল্লেখ্য, এই গল্পেই প্রফেসর ক্যলকুলাসের প্রথম আগমন। সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে থাকা গুপ্তধন খোঁজার টানটান উন্মাদনা কাহিনিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। গল্পের আঁট ততটা পোক্ত নয় ঠিকই। কিন্তু ইলাস্ট্রেশন এতটাই দৃষ্টিনন্দন যে, কোনও কমতি চোখে পড়ে না।
‘সূর্যদেবের বন্দি’র প্রিকুয়েল ‘মমির অভিশাপ’। দু:সাহসী অভিযানের ছন্দ তো টিনটিনের সমস্ত গল্পেই মিশে রয়েছে। কিন্তু এই কাহিনিকে আলাদা করেছে এর ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং ভৌতিক রস। এখন তো ইউটিউব ঘাঁটলে বিস্তর ডকুমেন্টারি মিলবে, কিন্তু আশি-নব্বইয়ের দশকের প্রায় সমস্ত খুদে পাঠককে ‘ইনকা সভ্যতা’র প্রথম পাঠ দিয়েছিল ‘মমির অভিশাপ'। অ্যামাজনের ঘন অরণ্যে চিরঘুমে শায়িত একটি আস্ত সভ্যতা, তার রহস্য উন্মোচিত হয় কাহিনির পরতে পরতে। গল্পের শেষটুকু টানটান। টিনটিনের উপস্থিতবুদ্ধির জোরে সবাই কীভাবে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরল, তা জানার নেশায় যে-কেউ বুঁদ হয়ে থাকবে।
‘চন্দ্রালোকে অভিযানে'র সিকুয়েল ‘চাঁদে টিনটিন’। দুটো গল্প একসঙ্গে পড়লে তবেই মিলবে আসল মজা! অ্যার্জের মধ্যে যে এক কল্পবিজ্ঞানীর সত্তাও মিশে ছিল, তা বহুবার বহু প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। ‘পান্না কোথায়’ গল্পে ক্যালকুলাসকে রঙিন টিভি আবিষ্কার করতে দেখা যায়, যখন কালার টিভির কোনও ধারণাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমহলে তৈরি হয়নি। এখানেও চাঁদে অভিযান সংক্রান্ত অনেক অজানা বিষয় লেখক উপস্থিত করেছেন, যেগুলো স্রেফ অলস মাথায় ফাঁদা গালগল্প নয়। চাঁদে পা রেখেই টিনটিন বলেছিল, আকাশে তারাগুলো মিটিমিটি জ্বলছে কই! তার এই বিস্ময়ের যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, পৃথিবী থেকে নক্ষত্রলোক ঝিকিমিকি জ্বলতে দেখা গেলেও চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে যে সেই দৃশ্য নজরে আসে না—এই তথ্য আর্মস্ট্রং চাঁদে পা রাখার অনেক আগেই লিখে রেখে গেছেন অ্যার্জে। এমনই অপার বিস্ময় ও বিজ্ঞানের আলোছায়ায় বোনা দুটি গল্প৷
মমির অভিশাপে ছিল ‘ইনকা’। এখানে ‘ইয়েতি’। পরে টেনিদার গল্পে ইয়েতির অন্য এক স্বাদ পাবে বাঙালি। গল্পের বিশেষত্ব কোনও খলনায়ক না থাকা। কাহিনির প্রধান ভিত্তি ‘বন্ধুত্ব’। অনেকটা পর্যন্ত পড়ে ইয়েতিকে ভিলেন বলে মনে হলেও গল্পের শেষ পাতার কিছু কথা চোখে জল নিয়ে আসে। যেমন নিখুঁত তথ্যের সমাবেশ, তেমনই নিপুণ অলংকরণ। তিব্বতের মঠ, মনেস্ট্রি, সেখানকার মানুষদের সারল্য, মানবিকতা এবং অবশ্যই বন্ধুত্বের বার্তা ছবি ও রেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আর সেকারণেই দলাই লামা ‘তিব্বতে টিনটিন’কে দিয়েছিলেন ‘ট্রুথ অব লাইটে'র সম্মান।