
ট্যাংরার হত্যাকাণ্ড।
শেষ আপডেট: 21 February 2025 08:56
প্রথমদিকে এই সব ব্যবসা ভাল চললেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দে পরিবারের অর্থনীতি। দেনার পরিমাণ বাড়তে থাকে। পাওনাদারদের দাবিও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। বহু ব্যবসায়িক চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ফলে প্রচণ্ড আর্থিক চাপে পড়ে গোটা পরিবার। জানা যায়, অন্তত ৬টি এজেন্সি থেকে কয়েক কোটি টাকার ঋণও নিতে হয়েছিল।
২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই সংস্থাগুলোর পরিচালক পদে ছিলেন পরিবারের দুই ভাই, প্রণয় দে ও প্রসূন দে। তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়দেরও বিভিন্ন সংস্থার পরিচালনায় রাখা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন, নমিতা দে (কাকিমা), প্রণবকুমার দে (কাকু), সুদেষ্ণা দে (প্রণয়ের স্ত্রী), রোমি দে (প্রণবের স্ত্রী), অনিতা দে ও বিভাস দে (পরিচয় জানা যায়নি), প্রদীপকুমার দে (প্রণয় ও প্রসূনের বাবা, প্রয়াত)।
দে পরিবারের এত লোক ব্যবসায় যুক্ত থাকলেও, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, তাঁরা ব্যবসা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। কাকিমা নমিতা দে বলেন, ‘আমাকে ডাইরেক্টর পদে রাখা হলেও ব্যবসার কিছুই জানতাম না। বাড়ির মেয়েদের এসব ব্যাপারে মাথা ঘামানোর রেওয়াজ ছিল না।’
তবে এই হত্যাকাণ্ডের পরে প্রশ্ন উঠেছে, দেনার চাপেই কি এই খুনখারাপি, নাকি অন্য কোনও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিল এই পরিবার।
এই ঘটনার পরে প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা জানিয়েছেন, দে পরিবার খুব একটা মিশুকে ছিল না। ফলে তাঁদের আর্থিক অবস্থার অবনতি সম্পর্কে অনেকেই জানতেন না। তবে পাওনাদারদের দাবি, তাঁরা বহুবার টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। জানা যাচ্ছে, দে ব্রাদার্স ২০২৪ সালেও বেশ কিছু লেনদেন করেছিল। তাদের সংস্থা প্রোটেকটিভ লেদার গ্লাভস-এর বর্তমান ডিলার আনাস মহম্মদ জানিয়েছেন, ‘২০২৪ সালেও আমাদের সঙ্গে লেনদেন হয়েছে।’
একথা শুনে মনে করা হচ্ছে, এক বছরের মধ্যে নিশ্চয় পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি তাদের ব্যবসা! তাহলে দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে আত্মহত্যা করতে যাওয়ার তত্ত্ব কি দাঁড় করানো যায়? আর যদি ধরে নেওয়াও যায়, দে পরিবারের তিনজন পুরুষ সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিলেন, সেক্ষেত্রে সুদেষ্ণা দে, রোমি দে ও তাঁদের কিশোরী কন্যাকে খুনের কারণ কী হতে পারে! ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, তাদের হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩৬-৪৮ ঘণ্টা আগে।
বুধবার সকালে বাইপাসের ধারে গাড়ি দুর্ঘটনার পরে পরিবারের তিন পুরুষ সদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই দুর্ঘটনার পরেই সামনে আসে, তাঁদের ‘আর্থিক অনটনের কারণে আত্মহত্যার চেষ্টা’ করার দাবি। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বলছে, আত্মহত্যা নয়, খুন করা হয়েছে তিন নারীকে।
মুম্বই থেকে আসা মৃত সুদেষ্ণার ভাই জানিয়েছেন, সোমবার বোনের সঙ্গে শেষ তার কথা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় আর্থিক সমস্যার কথা বোন জানাননি। আর এক আত্মীয় বলেন, ‘যা জীবনযাপন ছিল, যা বাড়ি! দেখে বোঝার উপায় ছিল? এত কিছু টের পেলে কি এটা হতে দিতাম?’
দে পরিবারের যে তিন পুরুষ সদস্য বেঁচে আছেন দুর্ঘটনার পরে, তাঁরা সুস্থ হলে হয়তো এই রহস্যের আসল উত্তর পাওয়া যাবে। আপাতত পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, এবং এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।