
ইস্তানবুলে বাজিমাত করে এসেছে প্রসার ভারতী
শেষ আপডেট: 23 October 2024 13:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস ধরে বাসে বা গাড়িতে যেতে যেতে অনেকেরই হয়ত চোখে পড়ে সাইনবোর্ড। নামটাও অনেকের চেনা। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। কলকাতা শহরের অলিখিত কিডনি। শহরের পুবদিক জুড়ে ১২৫ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়ানো এই জলাভূমিই সুদীর্ঘকাল জুড়ে বর্জ্য জলের প্রাকৃতিক শোধনাগার হিসেবে কার্যত কলকাতার জনজীবন ও বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করে চলেছে। এবার সেই জলাভূমির গল্প শুনিয়েই বিশ্বের দরবারে সম্মান জিতে নিল দেশের জাতীয় সম্প্রচারকারী সংস্থা প্রসার ভারতী। নেপথ্যে, আকাশবাণী বিভাগের কলকাতা কেন্দ্র।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্প্রচারকারী সংস্থাদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন হল 'এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন'। ১৯৬৪ সালে তৈরি হওয়া এই অ-সরকারি, অ-লাভজনক সংগঠনের সদস্য সংখ্যা বর্তমানে আড়াইশোর বেশি। ছড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর পাঁচটি মহাদেশের ৭০-টির বেশি দেশে। মূলত সদস্য সংস্থাদের পারস্পরিক আদানপ্রদান, সহযোগিতা ও সৃজনশীলতার এক বড় মঞ্চ হিসেবে ধরা হয় এই সংগঠনকে। সদর দফতর কুয়ালা লামপুরে। ভারতের তরফে এই সংগঠনের সদস্য প্রসার ভারতীর দুই বিভাগঃ 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' বা আকাশবাণী ও দূরদর্শন।
গতকাল ২২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তানবুলের একটি পাঁচতারা হোটেলে এই সংগঠনের ৬১-তম সাধারণ সভায় বাজিমাত করে এসেছে প্রসার ভারতী। নেপথ্যে, আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্র। সভায় বেতার (অডিও/রেডিও) বিভাগে মনোনয়ন দিয়েছিল বিশ্বের তাবড় দেশের বেতার বিভাগ। ছিল চিনের 'চিনা আন্তর্জাতিক রেডিও' (এককালের রেডিও পিকিং), ইন্দোনেশিয়ার 'ভয়েস অফ ইন্দোনেশিয়া', ইটালির 'রেডিওটেলিভিশন ইতালিয়ানা', অস্ট্রেলিয়ার এবিসি, বাংলাদেশ বেতার, ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান ব্রডকাস্টিং ইত্যাদি। সেখানেই 'রেডিও এবিইউ পার্সপেক্টিভ অ্যাওয়ার্ড' বিভাগে সেরার শিরোপা জিতে নিয়েছে অল ইন্ডিয়া রেডিও বা আকাশবাণীর বেতার তথ্যচিত্র 'হুইস্পার অফ আ ওয়েটল্যান্ডঃ আ ভিশন ফর টুমরো'।
এই তথ্যচিত্রের প্রযোজক, আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান আধিকারিক শুভায়ণ বালা ইস্তানবুল থেকে ফোনে দ্য ওয়ালকে জানালেন, দীর্ঘ পরিশ্রমের ফলাফল এল আজ। আকাশবাণীকে ধন্যবাদ জানিয়ে শুভায়ণ বলেন, "গোটা টিমকে ধন্যবাদ যাঁরা এই প্রজেক্ট এ কাজ করেছেন। চিত্রনাট্য, ভাষ্যপাঠ, গ্রাউন্ডওয়ার্ক-- সব ক্ষেত্রেই অনেকে মিলে কাজ করেছেন। এবং সব থেকে বেশি পূর্ব কলকাতার জলাভূমির সেই সব মানুষদের ধন্যবাদ, যারা এই জলাভূমিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। জলাভূমির আশেপাশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে যে সমস্ত মানুষেরা প্রতিনিয়ত তাদের জীবন যাপন করে চলেছেন, তাঁদের সহযোগিতা না থাকলে এই কাজ কখনোই সম্ভব ছিল না।"
প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু তথ্যচিত্রটি বানাতে গিয়ে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির অতীত ও বর্তমান-সহ সবকিছুর ওপরেই নাগাড়ে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন তাঁরা। দেখা হয়েছিল জলাভূমির ভৌগলিক, বাস্তুতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক গুরুত্বের নানা দিক। বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, জলাভূমিতে গিয়ে সেখানকার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বহু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। খুঁটিয়ে দেখা হয়েছিল বিভিন্ন গবেষণাপত্র। সরকার ও পুরসভার আধিকারিকদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছিল। শুভায়ণের কথায়, "ভবিষ্যৎ থিম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথমেই আমি যেখানে থাকি সেই কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের কথাই আমার মাথায় এসেছে। পূর্ব কলকাতা জলাভূমির ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে গবেষণা করতে ইচ্ছে জেগেছে। এটা না থাকলে কলকাতা নিজের নোংরা জলে নিজেই ডুবে যাবে। কারণ এই নোংরা জল যাওয়ার কোন জায়গা থাকবে না এবং সেই নোংরা জল পরিশোধিত করার জন্য যে পরিমাণ টাকা খরচা করে যন্ত্রপাতি লাগাতে হবে, তাতে যে পরিমাণ দূষণ হবে, তাতে কলকাতার আরো ক্ষতি হবে। শহরের মধ্যেই এক কোনায় নীরবে শহরকে, শহরের মানুষকে এত বছর ধরে জীবনযাত্রায় সহায়তা করে যাচ্ছে যে জলাভূমি, তার বিষয়ে বলার দায়িত্ব তো আমাদেরই নিতে হবে।"
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি আজ আন্তর্জাতিক 'রামসর সাইট' হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৭০ সালে ইরানের রামসর শহরে আয়োজিত জলাভূমি সংক্রান্ত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ভিত্তিতে আজ বিশ্বের বহু জলাভূমি এই তকমা পেয়েছে। বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও গবেষকদের নজরে এসেছে।পূর্ব কলকাতা জলাভূমির এই আন্তর্জাতিক শিরোপার পিছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন বিজ্ঞানী ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। যদিও আজ নানাভাবে এই জলাভূমির অস্তিত্ব সংকটে। নির্মাণকাজ, ভেড়ির দখলদারি এমনকি সম্প্রতি হোর্ডিং লাগানো নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। এই বছরেই জুলাইতে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি এলাকায় বেআইনি নির্মাণ নিয়ে প্রশাসনকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। নির্দেশ মেনে নির্মাণ ভাঙার কাজও শুরু করেছে প্রশাসন। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি বছর বর্ষায় প্লাবিত হচ্ছে কলকাতা। তার একটা বড় কারণ, পূর্ব কলকাতা জলাভূমির সংকট ও ধারণক্ষমতা হ্রাস। কলকাতার অস্তিত্বের জন্যই পূর্ব কলকাতা জলাভূমি নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। বাইজান্টাইন সম্রাটের শহরে, অটোমানদের রাজধানীতে, এশিয়া ও ইউরোপের মিলনস্থলে সেই জলাভূমির কথা বলেই জিতে এল ভারত। আরও একবার বিশ্বের দরবারে জায়গা পেল কলকাতা।