দ্য ওয়াল ব্যুরো: লখনৌতে আল কায়দার জঙ্গিদের ধরার জন্য যখন জাল বিস্তার করছে উত্তরপ্রদেশ এসটিএফ, তখন খাস কলকাতা থেকে ধরা পড়ল এই শহরে লুকিয়ে থাকা তিন বাংলাদেশি জঙ্গি। কলকাতা পুলিসের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের গোয়েন্দারা জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর ওই তিন জঙ্গিকে বেহালা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। জেএমবি-র তিন সক্রিয় সদস্যকে ধরার জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই ওত পেতে ছিল এসটিএফ। রবিবার তিন জঙ্গিকে গ্রেফতারের ফলে একই সঙ্গে উত্তরপ্রদেশ ও কলকাতায় বড়সড় জঙ্গি নাশকতার ছক বানচাল হল।
এদিনই উত্তরপ্রদেশে ধরা পড়ে আল কায়দার দুই সক্রিয় হ্যান্ডলারকে গ্রেফতার করে ওই রাজ্যের এসটিএফ। কলকাতায় ধৃতদের কাছ থেকে জেএমবি-র সঙ্গে সম্পর্কিত কাগজপত্র উদ্ধার করে।
কলকাতা পুলিশের এসটিএফের জয়েন্ট সিপি ভি সলোমন নেশাকুমার ও এসটিএফের ডিসি অপরাজিতা রাই বলেছেন, ধৃত তিনজনের সঙ্গেই জেএমবি-র শীর্ষ নেতাদের যোগসূত্র আছে বলে মনে করা হচ্ছে। ধৃতদের নাম, নাজিউর রহমান (২২), নিখিলকান্ত ও রবিউল ইসলামি (২২)। এই তিনজনই বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা। টুঙ্গিপাড়া হল বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মস্থান।
ধৃতদের কাছ থেকে একটি ডায়রি পাওয়া গেছে যার মধ্যে জেএমবি নেতাদের ফোন নম্বর লেখা আছে বলে জানিয়েছেন ডিসি অপরাজিতা রাই। তাছাড়া ধৃতদের কাছ থেকে একটি জেহাদি বইও উদ্ধার হয়েছে যার মধ্যে জেহাদ সম্পর্কিত নানা বক্তব্য লেখা আছে। এসটিএফ জানাচ্ছে, এই তিনজনের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও জেহান নিয়ে নানা পোস্ট রয়েছে। এমনকি এদের সঙ্গে আইসিসের যোগ রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। আইসিসের নথিও পাওয়া গেছে তিনজনের কাছে। আগামীকাল সোমবার ধৃতদের ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তোলা হবে বলে জানা গেছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, কলকাতায় আত্মগোপন করেছিল এই তিনজন। ঠিক কবে তারা কলকাতায় এসেছিল এবং কী উদ্দেশ্য নিয়ে তা এখনও জানা যায়নি। ধৃতদের জেরা করা চলছে। এদের কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট সহ আরও কিছু নথি মিলেছে বলে সূত্র মারফৎ জানা যাচ্ছে। এদের পরিচয়পত্রগুলি আসল না নকল, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ভারতে জাল বিস্তারের নানা ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে জেএমবি সংগঠন এমন তথ্য আগেই দিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। এনআইএ জানিয়েছে, বিহার, মহারাষ্ট্র, কেরল, কর্নাটকে জেএমবি জঙ্গিদের কার্যকলাপ বহুগুণ বেড়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের অ্যান্টি টেরর স্কোয়াড (এটিএস) এবং স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর প্রধানদের এ বিষয়ে সতর্কও করেছে এনআইএ। খাগড়াগড়-কাণ্ড এবং বুদ্ধগয়া বিস্ফোরণের ঘটনার পর বাংলাতেও জেএমবি জঙ্গিযোগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত বছর ডিসেম্বরে জেএমবি জঙ্গি সন্দেহে বীরভূম থেকে একজনকে পাকড়াও করেছিল রাজ্য পুলিশের এসটিএফ। ধৃতের নাম নাজিবুল্লাহ। এসটিএফের গোয়েন্দারা বলেছিলেন, সাইবার কাফের আড়ালে সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সন্দেহজনক কাজকর্ম চালাচ্ছিল নাজিবুল্লাহ। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাই ছিল তার টার্গেট। টাকার লোভ দেখিয়ে তাদের মগজধোলাইয়ের কাজ করত সে।
এর আগে গত বছর মে মাস নাগাদ, জেমবি-র অন্যতম শীর্ষ নেতা আবদুল করিমকে মুর্শিদাবাদ থেকে পাকড়াও করে কলকাতা পুলিশের এসটিএফ। জেমএমবি-র শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একজন এই আবদুল করিম বা বড় করিম। জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়া, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা থেকে সংগঠনের অর্থ জোগাড় করার মতো নানা গুরুদায়িত্ব ছিল এই করিমের কাঁধেই।
২০১৬ সালে জেএমবি-র যে ছ’জন পাণ্ডা কলকাতা পুলিশের এসটিএফের জালে ধরা পড়ে তাদের থেকে জেরা করে আরও এক জেএমবি শীর্ষনেতার হদিশ পেয়েছিল পুলিশ যার নাম সালাউদ্দিন। গোয়েন্দাদের অনুমান দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে নাম ও ডেরা পাল্টে দীর্ঘদিন গা ঢাকা দিয়েছিল সালাউদ্দিন। তাদের কার্যকলাপ বাংলাদেশে শুরু হয় বলে গোড়ায় সংগঠনের নাম ছিল ‘জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ’ বা জেএমবি। পরবর্তী কালে ভারতে সংগঠনের শাখা তৈরি হয় জেএমআই বা ‘জামাত-উল-মুজাহিদিন ইন্ডিয়া’ নাম দিয়ে। গোয়েন্দাদের দাবি, খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডের পরে পুরনো মডেল ভেঙে দিয়ে নতুন সদস্যদের নিয়ে ধুলিয়ান মডেল তৈরি করে সালাউদ্দিন। এই ধুলিয়ান মডেলের অন্যতম তত্ত্বাবধায়ক ছিল এই বড় করিম যাকে গ্রেফতার করা হয়। কলকাতায় এখন যারা ধরা পড়েছে তারা পুরনো না নতুন মডেলের সদস্য তা এখনও জানা যায়নি। তদন্ত শুরু হয়েছে।